কেন মাজহারুল ইসলামের স্থাপত্য ভাবনা সারা বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ, ব্যাখ্যা করলেন সুইস গবেষক গ্র্যাবার

‘স্পেসেস অব বিলংগিং’ শীর্ষক প্রদর্শনীতে মাজহারুল ইসলামের স্থাপত্যকর্মের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন নিকলাউস গ্র্যাবার। আজ বেলা একটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরের নিচতলায়।ছবি: প্রথম আলো

মাজহারুল ইসলামের কাছে ভবন শুধু ইট-কংক্রিটের কাঠামো ছিল না। ভবনকে তিনি দেখতে চেয়েছেন মানুষ, প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জীবন্ত স্থান হিসেবে। তাঁর স্থাপত্যে তাই খোলা টেরেস, বারান্দা, বাতাস চলাচলের সুযোগ, প্রকৃতির জন্য জায়গা এবং ভবিষ্যতে ব্যবহারের পরিবর্তনশীলতার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।

সুইস স্থপতি, গবেষক ও আলোকচিত্রী নিকলাউস গ্র্যাবারের চোখে মাজহারুল ইসলামের স্থাপত্যের এই বৈশিষ্ট্যগুলোই তাঁকে শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বস্থাপত্যেও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। গ্র্যাবার বলেন, মাজহারুল ইসলাম ভবনকে শুধু একটি বাক্সের মতো দেখতে চাননি। তিনি ভবনকে বাইরের পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। বারান্দা, খোলা টেরেস, ধাপে ধাপে সাজানো অংশ এবং চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে সংযোগ। এসব তাঁর স্থাপত্যের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরের নিচতলায় মাজহারুল ইসলামের স্থাপত্যকর্মের আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নিকলাউস গ্র্যাবার এ কথা বলেন। ‘স্পেসেস অব বিলংগিং’ শীর্ষক প্রদর্শনীতে মাজহারুল ইসলামের ১০টি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা প্রকল্পের ২৪টি আলোকচিত্র স্থান পেয়েছে এতে। প্রদর্শনীর সব ছবি তুলেছেন নিকলাউস গ্র্যাবার। আজ মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে প্রদর্শনীটির উদ্বোধন করা হয়। চলবে আগামী সাত দিন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নিকলাউস গ্র্যাবারের আলোকচিত্র প্রদর্শনীর একটি বিশেষ কারণ, পাহাড়ঘেরা ক্যাম্পাসের অনেকগুলো ভবনই মাজহারুল ইসলামের নকশায় করা। সবুজ এই ক্যাম্পাসের কোথাও পাহাড়ের ঢাল যেন ভবনের বারান্দা দিয়ে ঢুকে পড়ছে। ভবনের সঙ্গে মিলেমিশে গেছে পাশের গাছপালা আর প্রকৃতি।

নিকলাউস গ্র্যাবার স্থপতি মাজহারুল ইসলামকে নিয়ে এর আগে গবেষণামূলক একটি বইও লিখেছেন। ‘স্পেসেস অব বিলংগিং: দ্য আর্কিটেকচার অব মাজহারুল ইসলাম’ নামের বইটি ২০২৫ সালে সুইজারল্যান্ডের লুসার্ন থেকে প্রকাশিত হয়।

মাজহারুল ইসলাম (২৫ ডিসেম্বর ১৯২৩—১৪ জুলাই ২০১২)
ছবি: নাসির আলী মামুন, ফটোজিয়াম

আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের (এ আর মল্লিক ভবন) দ্বিতীয় তলার সিনেট কক্ষে ‘স্পেসেস অব বিলংগিং—দ্য আর্কিটেকচার অব মাজহারুল ইসলাম’ শীর্ষক বিশেষ আলোচনা সভা হয়।

সেখানে গ্র্যাবার বলেন, মাজহারুল ইসলামের স্থাপত্য নির্দিষ্ট সময় ও স্থানের সঙ্গে যুক্ত হলেও এর শিক্ষা সর্বজনীন। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে কীভাবে আধুনিক স্থাপত্য তৈরি করা যায় এবং একটি ভবন কীভাবে তার পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে পারে, এসব প্রশ্ন তাঁর কাজের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

প্রায় ১০ বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে মাজহারুল ইসলামের কাজ নিয়ে গবেষণা ও উপকরণ সংগ্রহ করেছেন গ্র্যাবার। তাঁর সংগ্রহে থাকা নকশা, অঙ্কন ও বিভিন্ন নথিও দেখেছেন তিনি। পরে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মাজহারুল ইসলামের কর্মজীবনের প্রাথমিক, মধ্য ও শেষ পর্যায়ের ১০টি ভবন নির্বাচন করে সেগুলোর ছবি তোলেন।

গ্র্যাবার বলেন, ১৯৬৫ সালে নির্মিত কোনো ভবনও আজকের দিনে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। পরিবেশ, বায়ুপ্রবাহ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, টেকসই নির্মাণ ও মানুষের প্রয়োজন। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে আলোচিত এসব বিষয় মাজহারুল ইসলামের অনেক ভবনেই দেখা যায়।

স্থানীয় ও বৈশ্বিক চিন্তার সমন্বয় ছিল মাজহারুল ইসলামের স্থাপত্যে। স্থানীয় স্থাপত্যের প্যাভিলিয়ন ও বারান্দার ধারণাকে তিনি আধুনিকভাবে ব্যবহার করেছেন। ভবনকে একটি নির্দিষ্ট ব্যবহারের মধ্যে আটকে না রেখে ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন ও পুনর্বিন্যাসের সুযোগ রেখেছেন। গ্র্যাবার এসব কাঠামোকে বলেছেন ‘এনেবলিং স্ট্রাকচার’।

মাজহারুল ইসলামের স্থাপত্যে প্রকৃতির জন্য জায়গা রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শুধু রাস্তা ও কংক্রিটে এলাকা ঢেকে না দিয়ে প্রকৃতি, পাখি ও জলাধারের জন্য জায়গা রাখার চিন্তা তাঁর পরিকল্পনায় ছিল। গ্র্যাবারের মতে, বর্তমানে নগর–পরিকল্পনায় আলোচিত ‘স্পঞ্জ সিটি’ বা প্রকৃতিনির্ভর নগরের ধারণারও পূর্বাভাস তাঁর কিছু পরিকল্পনায় পাওয়া যায়।

মাজহারুল ইসলামের অন্যতম বিখ্যাত স্থাপত্যকর্ম, ঢাকার চারুকলা ভবন
ছবি: সংগৃহীত

এর সবচেয়ে কাছের উদাহরণ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারপ্ল্যানে পাহাড় ও প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতিকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন মাজহারুল ইসলাম। পাহাড়ের ঢাল ও উচ্চতার রেখা বিবেচনায় নিয়ে ভবনগুলো এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে, যাতে সেগুলো ভূপ্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকে এবং প্রাকৃতিক দৃশ্যের অপ্রয়োজনীয় পরিবর্তন না ঘটে।

আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক মোহাম্মাদ আল আমিন বলেন, ‘স্থপতি হিসেবে মাজহারুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য যা করেছেন, তা গর্বের বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন ও স্থাপত্যশৈলী শিক্ষার্থীদের জন্য জ্ঞানের বড় উৎস। এসব স্থাপনা নিয়ে আরও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।’

উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আল-ফোরকান বলেন, ‘মোজাম্মেল হক অডিটোরিয়াম, আলাওল হল, শাহজালাল হলসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো ভবনগুলো গর্বের প্রতীক। এসব স্থাপত্যের পেছনে এখনো অনেক রহস্য রয়েছে, যা তরুণদের উন্মোচন করতে হবে।’ তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব স্থাপনা আবার ব্যবহারযোগ্য করার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরের পরিচালক অধ্যাপক জাহিদুর রহমান বলেন, ’মাজহারুল ইসলামকে নতুন করে আবিষ্কারের ক্ষেত্রে নিকলাউস গ্র্যাবারের বড় অবদান রয়েছে। তাঁর গবেষণা ও কাজ শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরতেই এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে।’

প্রদর্শনী উদ্বোধনের অনুষ্ঠান ও আলোচনা সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক মোহাম্মাদ আল আমিন, সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. সফিকুল ইসলাম এবং এ কে খান ফাউন্ডেশনের ট্রাস্টি এ কে শামসুদ্দিন খান ও এ এম জিয়াউদ্দিন খান উপস্থিত ছিলেন।