‘ভোটের হাওয়ায় পেটের জ্বালার কথাও ভাবতি হয়’

রাজশাহী নগরের তালাইমারী মোড়ে কাজের অপেক্ষায় আছেন দিনমজুরেরা। মঙ্গলবার সকালে দিকেছবি : প্রথম আলো

মাঘ মাস শেষের দিকে; শীত অনেকটাই কমে গেছে। তবে যাঁরা ভোরে ঘুম থেকে উঠে কাজে বের হন, তাঁরা এখনো শীতের তীব্রতা টের পান। রোজকার রাজশাহী নগরের তালাইমারী মোড়ে হাতে কোদাল আর ঝুড়ি নিয়ে জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন একদল মানুষ। চোখেমুখে ক্লান্তি, আর প্রতীক্ষা তাঁদের, যদি কেউ এসে আজ কাজের জন্য ডাকেন। এই মানুষগুলোর কাছে ভোটের ক্যালেন্ডারের পাতার চেয়েও জরুরি পকেটের অবস্থা।

আগামী বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট, কিন্তু তাঁদের মনে এই ভোট উৎসবের চেয়ে বেশি ঘুরপাক খাচ্ছে অভাবের চিন্তা। কারণ, তাঁরা প্রায় রোজই শহরে এসে কাজ না পেয়ে ফিরে যান। এই এলাকায় প্রতিদিন ভোর থেকে শ্রমিকেরা বিভিন্ন উপজেলা থেকে নিজেদের শ্রম বিক্রি করতে আসেন। তাঁরা রাজশাহী-২, রাজশাহী-৩, রাজশাহী-৫ ও রাজশাহী-৬ আসনের ভোটার। মঙ্গলবার সকালে তাঁদের সঙ্গে কথা হয়।

পুঠিয়া থেকে তালাইমারী এলাকায় আসা শামসুল হক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘পেট তো আর ভোট বোঝে না ভাই, পেট শুধু ভাত বোঝে। সপ্তাহে দুই-তিন দিন কাম না পাইলে সংসার চলবি ক্যামনে? বউ-বাচ্চার মুখে খাবার না দিতি পারলে ঘরে অশান্তি শুরু হয়। ভোটের হাওয়ায় পেটের জ্বালার কথাও ভাবতি হয়।’

শামসুল হন প্রতিদিন কাজের সন্ধানে রাজশাহী শহরে আসেন। প্রতিদিন ভোরে এলেও সপ্তাহে কাজ পান মাত্র দুই-তিন দিন। এ দিয়ে তাঁর সংসার চালানো কঠিন হয়ে উঠেছে। তিনি বলছিলেন, ‘রাজনৈতিক নেতারা ভোটের আগে উন্নয়ন, কাজ ও কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেন। তাঁর বাড়িতেও ভোট চাইতে গেছেন, কিন্তু বাস্তবে শ্রমিকদের জন্য এখন কাজের সুযোগ নেই। আমাদের এখন কাজ দরকার। কাজ না পেলে আমরা বাঁচতে পারব না।’

কাহাকে ভোট দিব? সবাই ভোটের আগে সুন্দর কথা কয়, পরে আর মনে রাখে না। এবারকার ভোটটা আমাদের জন্য খুব দামি। যারা আমাদের মতো গরিবের কথা ভাববি, তাদেরই আমরা দেখবি।
সবুজ ইসলাম, দিনমজুর

এক-দেড় বছর ধরে রাজশাহীর শ্রমবাজারে একধরনের স্থবিরতা কাজ করছে। ভোরে এসে দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করেও কাজ না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন অনেকে। চারঘাটের সবুজ ইসলাম সকাল ১০টা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থেকে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ক্ষোভ আর হতাশা মিশিয়ে তিনি বলেন, ‘কাহাকে ভোট দিব? সবাই ভোটের আগে সুন্দর কথা কয়, পরে আর মনে রাখে না। এবারকার ভোটটা আমাদের জন্য খুব দামি। যারা আমাদের মতো গরিবের কথা ভাববি, তাদেরই আমরা দেখবি।’

একই উপজেলার বাসিন্দা ফিরোজ আলী বলেন, ‘ছয় দিন আইছি, কাম পাইছি মাত্র তিন দিন। এই শীতের মৌসুমে তো কামকাজই নাই। এখন তো ভোট হবি। ভোটের আগেও কাম নাই শহরে। ভোটের পর পরিবেশ কেমন হয়, তার ওপর আমাদের কাজ নির্ভর করছে। নির্বাচনের পর আমাদের ভালো হবি তো, নাকি এখনকার চাইতে খারাপ হবি?’

পবার মো. আজিজের মাথায় ঋণের বোঝা। প্রতি সপ্তাহে ৭০০ টাকা কিস্তি দিতে হয়। কাজ থাকলে কিস্তি দেওয়া সহজ হয়, কাজ না থাকলে বাড়ে দেনার দায়। তাঁর একটাই চাওয়া, নির্বাচনের পর যেন এলাকায় শান্তি থাকে। আজিজ বলেন, ‘শান্তি থাকলে কাম পামু, কাম পাইলে কিস্তি শোধ হবি। আর কিছু লাগবি না আমাদের।’

নগরের উপশহর এলাকায় একটি নির্মাণাধীন ভবনে ইট টানছিলেন বিজলী মুর্মু। তাঁর বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে। তাঁর আক্ষেপের বিষয় হলো, পুরুষ শ্রমিকের চেয়ে তাঁর মজুরি ১০০-১৫০ টাকা কম। বিজলী মুর্মুর সোজা কথা, ‘হামরা কী দোষ করছি? কাম তো একাই করি। এই বৈষম্য কি কোনো দিন শেষ হবি না?’

নগরের গণকপাড়া মোড়ে বালু টানার কাজ করছিলেন আবদুল জব্বার। তিনি সদরের ভোটার। তাঁর কাছে রাজনীতির মারপ্যাঁচের চেয়ে বড় হলো দেশের স্থিতিশীলতা। তিনি বিশ্বাস করেন, দেশে যদি শান্তি থাকে আর দুর্নীতি না থাকে, তবে তাঁদের মতো সাধারণ মানুষের অন্তত দুমুঠো ডাল-ভাত জুটে যাবে