‘এই গ্রামে ঈদ নাই, সবার মন ভাঙ্গি গেছে’

দুর্ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছেন দুর্ঘটনাকবলিত গাড়িতে থাকা তরিকুল ইসলাম। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে রংপুরের কাউনিয়ার তালুক শাহাবাজ গ্রামেছবি : প্রথম আলো

কাঁচা রাস্তা থেকে বাড়িটি খানিকটা নিচুতে। বাড়ির উঠানে লাশ রাখার ৪টি খাটিয়া। উঠানের বাঁপাশে পুরোনা একটি কবরের পেছনে নতুন একটি কবর খোঁড়া। এই কবরে গতকাল বুধবার রাতে দাফন করা হয়েছে ১২ বছরের শিশু তাইয়্যেবাকে। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে রংপুরের কাউনিয়ার তালুক শাহবাজ গ্রামে গিয়ে এ দৃশ্য দেখা গেল।

গতকাল সকালে বগুড়ার শেরপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় তাইয়্যেবা ইসলাম ছাড়াও তার চাচা মমিনুল ইসলাম ওরফে রিন্টু (৪৫), চাচি মরিজন বেগম (৪০) ও ফুফু শিউলি বেগম (৬০) নিহত হন। তাঁদের বাড়ির পার্শ্ববর্তী কাউনিয়া উপজেলা কেন্দ্রীয় গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে। একই গ্রামের চারজনের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ হয়ে গেছে তালুক শাহবাজ গ্রাম।

গ্রামের বাসিন্দা আবদুল গফুরের (৬০) ভাষ্য, ‘এতগুলো মানুষ এই গ্রামের মারা গেল। আমাদের এত কষ্ট। কাল থাকি আমাদের কোনো আনন্দ নাই। এই গ্রামে ঈদ নাই। সবার মন দুঃখে ভাঙ্গি গেছে।’

নিহত চারজনের জানাজার পর পড়ে আছে খাটিয়া। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে রংপুরের কাউনিয়ার তালুক শাহাবাজ গ্রামে
ছবি: প্রথম আলো

ঢাকা–কুড়িগ্রাম মহাসড়কের ডান দিকে নেমে কিছুদূর এগোলে গাজীরহাটে যাওয়ার পাকা রাস্তা। মোটরসাইকেল থামিয়ে অটোচালক সোলায়মান আলীকে গাজীরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কথা জিজ্ঞাসা করতেই বললেন, ‘রিন্টুর বাড়ি যাইবেন? সোনার সংসারটা চোখের জলে ভাসি গেল।’

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মমিনুলের বাড়িতে গিয়ে কোনো পুরুষকে পাওয়া গেল না। বাড়ির ভেতর কয়েকজন নারীর কণ্ঠ শোনা গেল। বাড়ির উঠান থেকে সংবাদ পাঠিয়ে জানা গেল, তাঁরা কথা বলবেন না। খানিক পরে কয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিসহ বাড়িতে এলেন মমিনুলের বড় ভাই সাইফুল ইসলাম।

সাইফুল ইসলামরা চার ভাই, দুই বোন। এর মধ্যে গতকাল দুর্ঘটনায় মেজ ভাই মমিনুল, বোন শিউলি এবং আরেক ভাই শহিদুলের মেয়ে তাইয়্যেবা মারা গেছে।

সাইফুল ইসলাম জানান, গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে আটটার দিকে রাজধানীর শাহবাগ থেকে মাইক্রোবাস ভাড়া করে তাঁর ভাইবোনদের পরিবার ঈদ করার জন্য বাড়ির উদ্দেশে যাত্রা করে। গাড়িতে নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধসহ ১৭ জন ছিলেন। তাঁরা সবাই আত্মীয়স্বজন। গতকাল সাহ্‌রির সময়ও গাড়িতে থাকা সদস্যরা গ্রামের পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। সাইফুল ইসলাম জানান, চালক ভুল করে পাবনার দিকে চলে গিয়েছিলেন। অনেক দূর যাওয়ার পর আবার ঘুরে আসেন। চালকের তাড়া থাকায় দ্রুতগতিতে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। এ কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে।

সাইফুল বলেন, ‘এটা দুর্ঘটনা নয়, এটা মানুষোক ইচ্ছা করি মারি ফেলা। রোড চেনেন না, মানুষোক কইতেন। মানুষ বলি দিত। রোডে গাড়ি টানেন ১৩০। ওভারব্রিজ থেকে নামতেছে, তাও স্লো (ধীর) করেন নাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘শুনলোং, ড্রাইভার নাকি দুই রাত থাকি ঘুমায় না, খালি টিপ (ভাড়া) মারে।’

সাইফুল জানান, দ্রুতগতিতে চলার সময় চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে গাড়িটি সড়কের বিভাজকে আঘাত করে উল্টে যায়। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে তাঁরা সকালে বগুড়ায় চলে যান। সেখানে তাঁরা মমিনুল, শিউলি বেগম ও তাইয়্যেবার লাশ বগুড়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে দেখতে পান। তিনটি লাশ নিয়ে আসার সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে খবর পান, মমিনুলের স্ত্রী মরিজন বেগমও মারা গেছেন।

গতকাল রাত সাড়ে ১০টার দিকে গাজীরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে নিহত ব্যক্তিদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে শিশু তাইয়্যেবাকে বাড়ির উঠানে দাদার কবরের পেছনে এবং বাকি তিনজনকে কবরস্থানে দাফন করা হয়।

স্বজনেরা জানান, দুর্ঘটনায় অন্তত আটজন হাসপাতালে ভর্তি আছেন। শিশু তাইয়্যেবার বাবা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অফিস সহকারী (প্রকৌশলী শাখা) শহিদুল ইসলামও ওই গাড়িতে ছিলেন। তাঁর স্ত্রী রুম্মান রুমীর পা ও কোমর ভেঙে গেছে। তাঁর মেয়ে তাসমিয়া (২১) পায়ে আঘাত পেয়েছেন। তাঁদের রংপুরের কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

এ দুর্ঘটনায় বেঁচে গেছে ১ বছর ৪ মাসের শিশুকন্যা ফাতেমা জান্নাত ইলহাম। বগুড়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে আহত শিশুটিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য গতকালই রাজধানীর আগারগাঁওয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে নেওয়া হয়।

শিশুটির বাবা তরিকুল ইসলাম, মা মিতু আক্তার ও ভাই আবদুল্লাহ আল আরহাম (৭) একই গাড়িতে ছিল। তরিকুল হাইকোর্টের এক বিচারপতির ব্যক্তিগত কর্মকর্তা। তাঁর স্ত্রী অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে চাকরি করেন। তালুক শাহবাজ গ্রামের বাসিন্দা তরিকুল ইসলাম নিহত শিউলি বেগমের জামাতা।

তরিকুল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। ঘুম থেকে উঠে শুনি, গাড়ি পাবনার রাস্তায় অনেক দূর চলে গেছে। আবার তারা ব্যাক করে। সকাল সাতটা–সাড়ে সাতটার দিকে আমরা সবাই ঘুমের মধ্যে ছিলাম, হঠাৎ করে বিকট শব্দ। গাড়ি উল্টে যাচ্ছে। কী হচ্ছে, কোনো কিছু বুঝে উঠতে পারছি না। তারপর যখন গাড়িটা উল্টে স্থির হয়, তখন চোখ খুলে দেখি, গাড়িতে আগুন জ্বলছে। আমার স্ত্রী, সন্তান কাউকে খুঁজে পাচ্ছি না। আগুনের তাপ খালি বাড়ছে।’

তরিকুল জানান, স্থানীয় ব্যক্তিরা সহযোগিতা করেছিলেন। তাঁদের সহযোগিতায় আহত ব্যক্তিদের বগুড়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে থাকা মেয়ে ফাতেমার অবস্থা এখন স্থিতিশীল।