বিদ্যালয়ের একজন ছাত্রীর অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখন তাঁকে (মোক্তল হোসেন) অন্তত সাময়িক বহিষ্কার করা উচিত। এরপর তদন্ত করে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আরেকজন অভিভাবক বলেন, ‘যোগদানের সময় আমরা কইছিলাম মোক্তলের চরিত্র বালা (ভালো) না। এখন বুজুক কী অবস্থা? আমরার মেয়েদের গায়ে হাত দেয়।’

মোক্তল হোসেন গত বুধবার দুই দফায় নিজ বিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর শ্লীলতাহানি করেন। এ ঘটনায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে পুলিশসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হন। সংঘর্ষের সময় দুটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পুলিশ শটগানের গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে মোক্তল হোসেনকে মুক্ত করে থানায় আনা হয়।

শ্লীলতাহানির ঘটনায় ওই ছাত্রীর বাবা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মোক্তল হোসেনকে আসামি করে মামলা করেন। ওই মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। বর্তমানে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন মোক্তল হোসেন। এ ছাড়া পুলিশের ওপর হামলা, পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে দেবীদ্বার থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মুক্তার আহমেদ বাদী হয়ে ১০ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা ১৫০–২০০ জনকে অভিযুক্ত করে মামলা করেন। এ মামলায় গত বুধবার রাতে আটক ১০ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

এর আগে কুমিল্লার তিতাস উপজেলার ভিটিকান্দি ইউনিয়নের দুলারামপুর–সংলগ্ন ইসলামাবাদ গ্রামের জুনাব আলী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন মোক্তল হোসেন। ওই বিদ্যালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, চার বছর আগে বিদ্যালয়টির এক এসএসসি পরীক্ষার্থী ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে মোক্তল হোসেনের বিরুদ্ধে। তখন শিক্ষার্থীরা এ নিয়ে বিদ্যালয়ে বিক্ষোভ করে। পরে উপজেলা প্রশাসনের তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে বরখাস্ত করা হয়। এরপর মোক্তল হোসেন দেবীদ্বার উপজেলার ভারুল উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে যোগ দেন। সেখানে কিছুদিন থাকার পর তিন বছর আগে রাজনৈতিক প্রভাবে নিয়োগ পান মাশিকাড়া উচ্চবিদ্যালয়ে।

তিতাস উপজেলার জুনাব আলী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হুমায়ুন কবির প্রথম আলোকে বলেন, ‘অভিযোগ ওঠার পর ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে মোক্তল হোসেন এখান থেকে চলে যান। এর বেশি কিছু বলতে পারব না। উনি যখন প্রধান শিক্ষক ছিলেন, আমি তখন এই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। পরে প্রধান শিক্ষক হই। একজন প্রধান শিক্ষক হয়ে আরেকজন প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে কিছু বলতে চাই না। আপনি এলাকার অন্য মানুষের কাছ থেকে খবর নেন।’

ইসলামাবাদ গ্রামের বাসিন্দা ব্যবসায়ী ফারুক হোসেন বলেন, গুরুতর অভিযোগ ওঠায় তদন্ত করে তাঁকে (মোক্তল হোসেন) এখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

মাশিকাড়া উচ্চবিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগের সময় তাঁর (মোক্তল হোসেন) নিয়োগ বাতিলের জন্য এলাকাবাসী মানববন্ধন করেন। পরে নানা কারণে অঙ্গীকারনামায় সই করে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

এদিকে মোক্তল হোসেন এক বছর আগে দেবীদ্বার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হন। সমিতির একাধিক সূত্র জানায়, সমিতির নেতারা এখন পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেননি।

দেবীদ্বার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও দেবীদ্বার মফিজউদ্দিন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুজিবুর রহমান বলেন, ‘অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে আমরা তাঁকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিতে পারি না।’

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সকাল পৌনে নয়টায় প্রধান শিক্ষক মোক্তল হোসেন তাঁর কক্ষে বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ডেকে নেন। এরপর তিনি ওই ছাত্রীর স্পর্শকাতর স্থানে হাত দেন। দ্বিতীয় দফা বিদ্যালয়ের একটি শ্রেণিকক্ষে আবারও ওই ছাত্রীকে ডেকে নিয়ে একই ঘটনা ঘটান। এরপর ওই ছাত্রী বিষয়টি তার সহপাঠীদের জানায়। সহপাঠীরা তাকে নিয়ে বাড়ি গিয়ে ছাত্রীর বাবাকে জানায় বিষয়টি। এরপর এলাকার লোকজন বিদ্যালয়ে গিয়ে মোক্তল হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মারধর করেন। এ সময় এই প্রধান শিক্ষকের সমর্থনে আসা এলাকার কয়েকজন বহিরাগত ব্যক্তির সঙ্গে কয়েকজন ছাত্রের প্রথমে হাতাহাতি ও পরে মারামারি হয়। এ সময় অন্তত ১২ জন আহত হন।