ময়মনসিংহে ১১–দলীয় জোটের সংসদ সদস্য ও বিএনপির পরাজিত প্রার্থী মুখোমুখি
ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য মুহাম্মদুল্লাহ ও গত জাতীয় নির্বাচনে আসনটিতে বিএনপির পরাজিত প্রার্থী মোতাহার হোসেন তালুকদারের মধ্যে বিরোধ সংঘাতে রূপ নিয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার তারাকান্দা উপজেলায় নববর্ষের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া নিয়ে সংসদ সদস্যকে হেনস্তা ও তাঁর কর্মী–সমর্থকদের মারধর এবং এর প্রতিবাদে ১১ দলের বিক্ষোভে হামলার অভিযোগ উঠেছে বিএনপির বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে পাল্টা বিভিন্ন অভিযোগ তুলেছেন বিএনপির পরাজিত প্রার্থী। আজ বুধবার দুপুরে ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবে পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন করেছে দুই পক্ষ। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে উত্তাপ শুরু হয়েছে।
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা) আসনে স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন মুখ ১১–দলীয় নির্বাচনী জোট–সমর্থিত বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুহাম্মদুল্লাহ ১ লাখ ৪৬ হাজার ২০২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ময়মনসিংহ উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোতাহার হোসেন তালুকদার পান ১ লাখ ১৮ হাজার ৪৩৮ ভোট।
দুপুর সাড়ে ১২টায় ময়মনসিংহ প্রেসক্লাব মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে মুহাম্মদুল্লাহ জানান, গতকাল তারাকান্দা উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে বিএনপির পরাজিত প্রার্থীর সমর্থকদের সঙ্গে তাঁর (মুহাম্মদুল্লাহ) সমর্থকদের বাগ্বিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এর প্রতিবাদে এদিন বিকেল চারটায় তারাকান্দা বাজারে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলের শেষ দিকে মোতাহার হোসেন তালুকদারের নির্দেশে তাঁর নেতা–কর্মীরা অতর্কিত হামলা চালান ১১–দলীয় নেতা–কর্মীদের ওপর। এতে ১০–১৫ জন আহত হন। তাঁরা সংকটাপন্ন অবস্থায় মাওলানা হেদায়াতুল্লাহ ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
সংসদ সদস্য লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘আমি বিএনপির সঙ্গে সব সময় সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চেয়েছি। কিন্তু পরাজিত প্রার্থী মোতাহার হোসেন তালুকদার তাঁর নেতা–কর্মীদের নিয়ে বিরূপ আচরণ করেই যাচ্ছেন। গত পরশু জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মিটিং শেষে মোতাহার হোসেন তালুকদার জেলা প্রশাসকের সামনেই আমাকে হুমকি দেন। আজ তাঁরই ইশারায় আমার ওপর এই হামলা হয়েছে। ইতিপূর্বে তাঁর লোকজন আমার ইফতার মাহফিলে হামলা করেছে, ভাঙচুর করেছে। বিভিন্ন রাস্তাঘাট, প্রতিষ্ঠান ঠিকাদারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে জোরপূর্বক উদ্বোধন করে যাচ্ছেন। তিনি চান আমি কোনো সরকারি অনুষ্ঠানে যেন প্রধান অতিথি হিসেবে না থাকি, তিনি থাকবেন। এ জন্যই তাঁর এই হামলা। তিনি আমাকে আমার সংসদীয় এলাকায় ঢুকতে দেবেন না বলে হুমকি দিয়ে বেড়ান। আমি জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি। আমাকে উন্নয়নকাজে অংশ নিতেই হবে।’
পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সংসদ সদস্য মুহাম্মদুল্লাহ বলেন, ‘মোতাহার হোসেন তালুকদারের সঙ্গে আমার কোনো মূল বিরোধ নেই। বিরোধ হলো, তিনি পাস করেননি; কিন্তু আমি অল্প সময়ে এমপি হয়েছি। সে কারণে আমি এমপিগিরি কীভাবে করি তিনি (মোতাহার হোসেন) দেখিয়ে দেবেন। তিনি বলে বেড়ান, কাগজে–কলমে আমি সংসদে যেন এমপিগিরি করি, এলাকায় তিনি এমপিগিরি করবেন। আমাকে এলাকায় ঢুকতে দেবেন না। এটা হলো ওনার প্রতিহিংসা ও শক্তিমত্তার প্রদর্শন, এর ভিন্ন কিছু নয়। আমাদের ওপর হুমকি থাকলেও সরাসরি এ ধরনের আক্রমণ আগে হয়নি। নির্বাচনে তিনি পরাজিত হয়েছেন, সেটি মেনে করতে পারছেন না এবং তারাকান্দা ও ফুলপুর উপজেলায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হুমকি দেন।’
স্বাভাবিক কার্যক্রমেও বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে অভিযোগ করেন সংসদ সদস্য। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ভয়ে আছি, এমনটা নয়; পরিবেশটা নষ্ট হোক, তা চাচ্ছি না। তিনি যেটা চাচ্ছেন, পরিবেশ নষ্ট করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে, সেটা আমরা দিতে চাচ্ছি না। আমরা চাচ্ছি পরিবেশটা সুন্দর আছে দেশের, সেটা শেষ পর্যন্ত যেন থাকে এবং বিএনপির যাঁরা আছেন, তাঁদের সঙ্গে নিয়েই কাজ করতে চাই। আমার প্রতিপক্ষ বিএনপি নয়। বিএনপির সবাই মোটামুটি ভালো। কিন্তু মোতাহার ও তাঁর সঙ্গে কিছু লোক আছে, এরাই শুধু প্রতিপক্ষ। আমি আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য দলের ওপর মহলে কথা বলেছি। সবকিছু প্রস্তুত করা হচ্ছে। আমরা আইনি প্রক্রিয়ার দিকে যাব।’
এদিকে বেলা সাড়ে তিনটার দিকে ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে নিজের পক্ষে বক্তব্য তুলে ধরেন উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও নির্বাচনে বিএনপির পরাজিত প্রার্থী মোতাহার হোসেন তালুকদার। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নানা কারচুপির অভিযোগ তোলেন এবং এ নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলার কথা জানান। মোতাহার হোসেন দাবি করেন, গতকাল সংসদ সদস্যের লোকজনের ওপর কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি। তিনি বলেন, ‘মেয়েদের শরীরে এমপির অনুসারীদের ধাক্কা লাগাকে কেন্দ্র করে স্কুলের ছেলেদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা হলে আমি তা থামিয়ে দিই। এখানে আমাদের দলীয় কোনো লোক ছিল না। বিকেলে মিছিলে আমাদের লোকজনের সঙ্গে হাতাহাতি হয়েছে। তবে যে লোকটিকে মারধর করা হয়েছে বলা হচ্ছে, তাঁর শরীরে মুরগির রক্ত মাখিয়ে নাটক সাজানো হয়েছে, তিনি আসলে আহত হননি।’
এমপির স্বাভাবিক কাজে বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ অস্বীকার করে মোতাহার হোসেন বলেন, ‘আমি যে কাজ করি, তা নিয়ে ফেসবুকে ব্যঙ্গ করেন এমপি ও তাঁর কিছু পেইড লোক। আমি এলাকার মানুষের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর তিনি মাত্র এমপি হয়েছেন। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তারাকান্দা-ধোবাউড়া রাস্তা আমি অনুমোদন করিয়ে এনেছি এবং আমি উদ্বোধন করেছি। ছোট রাস্তা উদ্বোধন করতে এমপি লাগবে—এমন আইন থাকলে, দেখাতে পারলে আমি মেনে চলব। তবে এখন আমরা সামাজিক কারণে এ কাজ করছি।’
বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, ‘তিনি (সংসদ সদস্য মুহাম্মদুল্লাহ) কোনো না কোনোভাবে এমপি হয়েছেন। এখন আমার প্রতি তাঁর কেন এত হিংসা-বিদ্বেষ, এটা বুঝি না। আমি কি রাজনীতি ছেড়ে দেব মুহাম্মদুল্লাহর ঈর্ষার কারণে? নাকি এলাকায় যাওয়া বন্ধ করে দেব? সিসিটিভি ফুটেজ দেখে যদি আমাদের দলীয় কোনো নেতা–কর্মী এ ঘটনায় থাকে বা এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে আমি নিজে পুলিশ সুপারকে ফোন করে দেব যেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’