হাওরপারে গোঁসাই বাড়ির পলাশগাছের গল্প

গাছের মাথায় পলাশ ফুল। ৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ভুজবল গ্রামেছবি: প্রথম আলো

বসন্ত এসে গেছে। ধান কাটা শেষ হয়েছে অনেক দিন। পথের পাশে খড়ের মাঠে ছেলেরা দল বেঁধে ফুটবল খেলছে। খাইঞ্জার হাওরে বোরোখেতে কাজ করছেন কেউ কেউ। মাঠের ওপর কিছু চিল একা, কিছু দল বেঁধে উড়ছে।

খাইঞ্জার হাওর থেকে হঠাৎ চোখে পড়ে হাওরপারের গ্রামের একটি বাড়ির গাছপালার মাথায় যেন স্তূপ হয়ে আছে একগুচ্ছ আগুনের শিখা। হাওয়ায় সেই আগুনের শিখা দুলছে। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের ভুজবল গ্রামের এই বাড়ি ‘গোঁসাই বাড়ি’ নামে পরিচিত। বাড়ির পুকুরপাড়ের গাছেই এমন আগুনের শিখার মতো পলাশ ফুল ফুটেছে। ফুল দেখে ‘পিন্দারে পলাশের বন পালাব পালাব মন...’ গানের কথা মনে পড়ে যায়।

বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে খাইঞ্জার হাওর এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখা গেছে, রাস্তার পাশে কেউ খেত থেকে বোরো ধানের চারা তুলছেন, কেউ চারা রোপণ করছেন, কেউ খেতে পানি দেওয়ার ব্যবস্থা করছেন। স্থানীয় লোকদের কেউ কেউ পতিত মাঠ দেখিয়ে জানালেন, পানির ব্যবস্থা না থাকায় এই খেতে বোরো চাষ সম্ভব হয়নি। খেতের পাশ দিয়েই গেছে কোদালীছড়া। পাড়ে বুনো কিছু গাছের মধ্যে অনেক চিল বসে আছে।

পলাশগাছের পাশে ফুটেছে উদাল ফুল। ৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ভুজবল গ্রামে
ছবি: প্রথম আলো

গোঁসাই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে পলাশ ফুলের একটি গাছ নয়, ছোট-বড় অনেক গাছ ছড়িয়ে আছে বাড়ির এখানে-সেখানে। বাড়ির পুকুরপাড়ে, রাস্তার পাশে, ঝোপঝাড়ের ভেতর ছড়ানো-ছিটানো অনেক গাছ। ছোট-বড় পাঁচ-ছয়টি গাছে পলাশ ফুল ফুটেছে। এর মধ্যে বেশ কিছু গাছ ২০-৩০ বছর বা তার চেয়ে বেশি পুরোনো। পুকুরপাড়ের দুটি গাছে বেশি ফুল ফুটেছে। গাছগুলোর মাথায় আগুন রঙের ঢেউ খেলছে। ফুল ঝরে পড়ছে গাছের নিচে। গাছতলা অনেকটা নকশা তোলা রঙিন চাদরের মতো হয়ে আছে। ফুলের কাছে শালিক ও কাঠশালিক পাখিই বেশি দেখা গেছে। তারা এক ডাল থেকে অন্য ডালে উড়ে গিয়ে বসছে। বাড়ির লোকজনের ধারণা, গাছগুলো প্রাকৃতিকভাবেই গজিয়েছে। বাড়ির উত্তরাধিকারীদের কেউই বলতে পারছেন না, পলাশ গাছগুলো কে লাগিয়েছেন। ফুল ফোটা একটি পলাশগাছের পাশে দুটি উদালগাছের ডালে ডালে ঝাঁক বেঁধে সোনালি রঙের ফুল ফুটেছে।

গাছের নিচে পড়ে আছে পলাশ ফুল। ৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ভুজবল গ্রামে
ছবি: প্রথম আলো

বাড়ির অংশীদারদের একজন নারায়ণ গোস্বামী জানালেন, কীভাবে এখানে পলাশ ফুলের গাছগুলো হয়েছে, তাঁর ধারণা নেই। প্রতিবছর এই সময়ে ফুল ফোটে। আলাদা করে গাছগুলোর পরিচর্যার কোনো প্রয়োজন পড়ে না।

অপর অংশীদার ফণী বাগচি বললেন, প্রায় ২০ বছর আগে একটি গাছ কেটে তিনি ঘরের কাজে লাগিয়েছিলেন। সেই গাছের গোড়া থেকে ডালপালা গজিয়ে এখন ওই গাছটিই অনেক বড় হয়ে গেছে। তিনিও বলতে পারেননি, তাঁদের বাড়িতে এত পলাশগাছ থাকার কারণ।

গাছগুলো কেটে ফেলা না হলে হয়তো ভবিষ্যতে এই বাড়িটি ‘পলাশ বাড়ি’ নামেই পরিচিত হয়ে উঠতে পারে। বসন্তে রঙের আগুন লাগবে তখন বাড়িটিতে। এসব ভাবতে ভাবতেই পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবছে। গোধূলির রঙে তখন প্রকৃতি স্তব্ধ, নির্জন হয়ে গেছে। সেই রঙের সঙ্গে মিশে গেছে পলাশ ফুল। ধীরে সন্ধ্যা এসে পলাশ বাড়িটিকে রাতের আঁধার জড়িয়ে ধরতে শুরু করেছে।