জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে দৃষ্টিশক্তি হারানো মাদারীপুরের সুমন ও শুভ আবার দেখতে চান

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে দৃষ্টিশক্তি হারান সুমন দেওয়ান। গত রোববার মাদারীপুর শহরের শান্তিনগর এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

মাদারীপুরের সুমন দেওয়ান (৩৬) পেশায় একজন রাজমিস্ত্রি ছিলেন। এক বছর আগেও বেশ ভালো ছিল তাঁর আয়রোজগার। স্বাভাবিক জীবনে থাকলে সুমন হয়তো এত দিন তাঁর পছন্দের মানুষটিকে বিয়ে করে সংসার শুরু করতেন। কিন্তু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে সুমন এখন বিভীষিকাময় জীবন কাটাচ্ছেন। মা-বাবাহারা সুমন তাঁর বড় বোনের সংসারেও বোঝা হয়ে উঠেছেন।

হতাশা নিয়ে সুমন দেওয়ান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি কখনো ভাবি নাই, চোখে দেখতে পাব না। অন্ধত্ব নিয়ে সারা জীবন থাকতে হবে। এখন যত দিন যাচ্ছে, সবকিছু অন্ধকার হয়ে আসতেছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি। কারও ওপর বোঝা হয়ে থাকতে চাই না। যত দিন যাচ্ছে, সামনের জীবনটা শুধু কঠিন হয়ে আসতেছে। এসব বললেও কেউ বুঝবে না। কারণ, যার চোখ নাই, সে–ই বোঝে কষ্টটা কী।’

সুমনের পৈতৃক বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলায়। তাঁর বাবা রশীদ দেওয়ান কাজের সুবিধার্থে চার দশক আগে মাদারীপুর শহরের শান্তিনগর এলাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করেন। ৩০ বছর আগে সুমনের বাবা ও ১৫ বছর আগে তাঁর মা নূর জাহান বেগম মারা গেছেন। এরপর থেকে সুমন তাঁর বড় বোন শিল্পী বেগমের বাড়িতে থাকেন।

সুমনের বোন শিল্পী বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ধারদেনা করে ভাইয়ের চোখের চিকিৎসা করাইছি। যখন চোখে গুলি লাগল, তখন অনেক জায়গায় চিকিৎসার জন্য গেছি। কিন্তু ভালো চিকিৎসা পাই নাই। শুরুতে ভালো চিকিৎসা পেলে সুমন হয়তো অন্ধ হয়ে যেত না।’

শিল্পী বেগম আফসোস করে বলেন, ‘ভাই রাজমিস্ত্রির কাজ করত। এখন বেকার। ওর একটা ঠিকানা দরকার। আমি আর কদিন বাঁচব। সুমন মাঝেমধ্যেই চোখের ব্যথায় কাঁদে। ওর জন্য খারাপ লাগে। আমাদেরও সেই সামর্থ্য নাই যে ভাইয়ের ভালো চিকিৎসা করাব। সরকার থেকে যা দিছে, তা ধারদেনা শোধ করতেই চলে গেছে।’

গত বছরের ১৮ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনে যোগ দেন সুমনের ভাগনে কলেজছাত্র স্বপ্ন শিকদার। তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে সুমন প্রথমে যান মাদারীপুর সরকারি কলেজে। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন স্বপ্ন তার বন্ধুদের সঙ্গে আন্দোলনে অংশ নিয়েছে এবং মিছিল নিয়ে শহরের শকুনি লেকপাড়ে গেছে। সুমন সেখানে গিয়ে আন্দোলনে যোগ দেন এবং ভাগনেকে খুঁজতে থাকেন। সে সময় পুলিশের ছোড়া রাবার বুলেট তাঁর চোখমুখে ও শরীরের বিভিন্ন অংশে লাগে। রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে মাদারীপুর জেলা হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানেও ছাত্রলীগের হামলায় বেশি সময় থাকতে পারেননি। পরে পালিয়ে গিয়ে ফরিদপুর মেডিকেলে চিকিৎসা নেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তাঁর দুচোখে ক্ষত হয়ে ডান চোখ পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যায়। বাঁ চোখেও দেখেন ঝাপসা। এরপর কয়েক দফা চোখে অস্ত্রোপচার করলেও তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে দৃষ্টিশক্তি হারানো শিক্ষার্থী শুভ ব্যাপারীর চোখে স্বপ্ন ফেরানোর আকুতি। সম্প্রতি মাদারীপুর পৌর শহরের চর কুকরাইল এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

দৃষ্টিহীন চোখে স্বপ্ন ফেরানোর আকুতি

মাদারীপুর পৌর শহরের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের চর কুকরাইল এলাকার মো. সোহেল ব্যাপারীর ছেলে শুভ ব্যাপারী (১৯)। শুভ মাদারীপুর সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী।

গত বছর ১৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সহপাঠীদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেন শুভ। সে সময় পুলিশের ছোড়া রাবার বুলেটে তিনি গুরুতর আহত হন। তাঁর সারা শরীরে ১৯০টির বেশি রাবার বুলেটের ক্ষতচিহ্ন। এর মধ্যে দুই চোখসহ মাথায় রয়েছে ৫৬টি বুলেট। উন্নত অপারেশনের অভাবে বুলেটগুলো বের করা যায়নি। ইতিমধ্যে বাঁ চোখের দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছেন। ডান চোখও নষ্ট হওয়ার পথে।

শুভ ব্যাপারী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগে শুধু চোখে সমস্যা ছিল। এখন পুরো মাথায় ব্যথা হয়। বাম চোখে কিছুই দেখতে পাই না। ডান চোখেও ঝাপসা দেখি। একা একা কোথাও যেতে পারি না। পড়ালেখা করতে পারছি না। কাজও করতে পারছি না। জীবনটা যে কীভাবে চলছে, তা আমি ও আমার পরিবার ছাড়া কেউ বোঝে না। প্রতিদিন যন্ত্রণা সহ্য করতে হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে যে অনুদান পাইছি, তা দিয়ে উন্নত চিকিৎসা সম্ভব না। সরকারের কাছে একটাই চাওয়া, আমরা যেন আগের মতো দেখতে পারি। চোখ আর মাথা ভালো থাকলে আমরা নিজেরাই কিছু একটা করে বাঁচতে পারব।’

শুভ ব্যাপারীর মা লিপি বেগম বলেন, ‘আমাদের একটা জমি ছিল। সেই শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে ছেলের চিকিৎসা করাইছি। ওর বাবার দোকানটাও নাই, তিনিও বেকার। এখন অন্যের জায়গায় বসবাস করতেছি। আত্মীয়স্বজনদের থেকে সাহায্য–সহযোগিতা নিয়ে কোনোরকমে চলে যাচ্ছে। সরকারের কাছে অনুরোধ, আমার ছেলেটার জন্য যেন দ্রুত সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করে এবং শুভকে একটা পুনর্বাসন ও ওর বাবাকে একটা কাজের ব্যবস্থা করে দেয়। যাতে আমরা কিছু একটা করে বাঁচতে পারি। এর থেকে বেশি কিছু চাই না।’

মাদারীপুর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক আহ্বায়ক নেয়ামত উল্লাহ বলেন, ‘মাদারীপুরে আন্দোলন চলাকালে চারজন গুরুতর আহত হয়ে তাঁদের চোখ হারিয়েছেন। চোখের চিকিৎসায় সরকারের পক্ষ থেকে যে সাহায্য করা হয়েছে, তা পর্যাপ্ত নয়। চোখের দৃষ্টি ফেরানোর জন্য দেশের বাইরে চিকিৎসা প্রয়োজন। সরকারের কাছে আমরা বিষয়টি জানিয়েছি। জুলাইয়ে আহত যোদ্ধাদের সুচিকিৎসা না করাতে পারলে এই বিপ্লব বিফল হবে। আশা করছি, সরকার অতি দ্রুত আহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে সব ধরনের সহযোগিতা করবে।’