ফরিদপুরে তিনজনকে কুপিয়ে হত্যা: অভিযুক্ত আকাশের খোঁজ রাখতে চায় না পরিবার

ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও প্রতিবেদশীদের ভিড়। সোমবার রাতে ফরিদপুর সদরের আলিয়াবাদ ইউনিয়নের গদাধরডাঙ্গী গ্রামেফাইল ছবি: প্রথম আলো

ফরিদপুর সদরে তিন খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার আকাশ মোল্লার (২৮) কোনো খোঁজ রাখতে চায় না তাঁর পরিবার। তাঁদের ভাষায়, তাঁর কারণেই তিনটি পরিবারে নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়।

গতকাল সোমবার রাত ১০টার দিকে ফরিদপুর সদরের আলিয়াবাদ ইউনিয়নের গদাধরডাঙ্গী গ্রামে দাদি আমেনা বেগম (৮০), ফুফু রাহেলা বেগম (৫৫) ও প্রতিবেশী কাবুল চৌধুরীকে (৪৯) হত্যার অভিযোগ ওঠে আকাশ মোল্লার বিরুদ্ধে। এ ঘটনার পর দায়ের করা মামলায় তাঁকে একমাত্র আসামি করা হয়।

ওই ঘটনায় নিহত কাবুল চৌধুরীর মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল মঙ্গলবার আলিয়াবাদের খুশির বাজার এলাকার ইসলামি মিশন কবরস্থানে দাফন করা হয়। তিনি স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তান নিয়ে বোনের জমিতে থাকতেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন কাবুল। মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে একটি ব্যাটারিচালিত ভ্যান কিনেছিলেন তিনি। এখন সেই ঋণ শোধ ও সন্তানদের লালন-পালন নিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে পরিবারটির।

কাবুলের স্ত্রী কোহিনূর বেগম বলেন, ‘আমারে দেখার কেউ নেই। সন্তানদের খাওয়াব কীভাবে, কিস্তি দেব কীভাবে—কিছুই বুঝতে পারছি না।’ তিনি জানান, ছয় মাস আগে তাঁদের বড় ছেলেও মারা গেছে।

নিহত আমেনা বেগম তিন ছেলে ও এক মেয়ের মা। তাঁর মেয়ে রাহেলাও এ ঘটনায় নিহত হয়েছেন।

আমেনার ছেলে বারেক মোল্লা বলেন, ‘মায়ের টানেই আমরা এক হয়ে থাকতাম। এখন সব শেষ হয়ে গেছে।’ আমেনা বেগমকে গতকাল সন্ধ্যায় পারিবারিক কবরস্থানে স্বামীর কবরের পাশে দাফন করা হয়।

গতকাল রাহেলাকে আলিয়াবাদ কবরস্থানে দাফন করা হয়। তাঁর স্বামী ওয়াহাব মুন্সী কৃষিকাজ করেন। তাঁদের দুই ছেলে ও দুই মেয়ে এ তথ্য জানিয়ে ছোট ছেলে মিঠুন মুন্সী বলেন, ‘মাকে ছাড়া কীভাবে বাঁচব বুঝতে পারছি না। দাদি নাই, দাদা বাড়ি আর যাওয়া হবে না। একমুহূর্তের মধ্যে আমার নিঃস্ব হয়ে গেলাম। সোনার সংসার ছিল, তা হারিয়ে গেল।’

আকাশের প্রতি পরিবারের ক্ষোভ

ঘটনার পর আকাশ মোল্লার প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা। তাঁরা জানিয়েছেন, তাঁর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখতে চান না। আকাশের চাচা বারেক মোল্লা বলেন, ‘আমরা কেউ তাঁর সঙ্গে দেখা করিনি, দেখার ইচ্ছাও নেই। তাঁর জন্য তিনটি পরিবার শেষ হয়ে গেছে।’

আকাশের ভাই সোহান মোল্লাও একই কথা জানিয়ে বলেন, ‘আকাশের জন্য তিনটি পরিবার নিঃশেষ হয়ে গেছে। তার কোনো খবর রাখার ইচ্ছা আমাদের নেই।’

পুলিশ জানায়, গতকাল ভোরে গদাধরডাঙ্গী গ্রামের একটি কলাবাগান থেকে আকাশকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। থানায় কয়েক ঘণ্টা অবস্থানের সময়ও পরিবারের কেউ তাঁর সঙ্গে দেখা করেননি।

মানসিক সমস্যার কথা বলছে পরিবার

পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন, আকাশ দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। একসময় তিনি পড়াশোনায় মেধাবী ও ধার্মিক ছিলেন এবং কুষ্টিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগও পেয়েছিলেন; তবে পরিবারের সদস্যদের দেখাশোনা করতে হবে বলে তাঁকে কুষ্টিয়া যেতে দেওয়া হয়নি।

পরিবার জানায়, জমি নিয়ে বিরোধের জেরে আকাশকে প্রতিপক্ষের সাত-আটজন মারধর করে। এ ঘটনায় আকাশ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। সব সময় মৃত্যুভয় তাঁকে পেয়ে বসে। পরে স্নাতকোত্তরের পরীক্ষায় অকৃতকার্যও হয় আকাশ। পরে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাঁর মানসিক চিকিৎসাও করানো হয়। নিয়মিত ওষুধ সেবন না করায় তাঁর মানসিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। পাশাপাশি আকাশকে ব্যস্ত রাখার জন্য কোনো কাজে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।

আরও পড়ুন

আকাশের চাচা বারেক মোল্লা জানান, বাড়িতে আসার পর আকাশের যক্ষ্মা হাসপাতালে চাকরি হয়। চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি ওষুধ নিয়মিত খেতেন না। মাসে একটি ইনজেকশন দেওয়ার কথা থাকলেও নিয়মিত নিতেন না। ওষুধ খেতে চাইতেন না বলে ভাতের মধ্যে লুকিয়ে ওষুধ খাওয়াতে হতো। নিয়মিত ওষুধ না খাওয়ায় তার মানসিক সমস্যা বড়তে থাকে এবং এক পর্যায়ে তাঁর চাকরি চলে যায়।

এদিকে এ হত্যা মামলার সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে জানতে চাইলে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সিরাজুল ইসলাম বলেন, গতকাল দুপুরে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে আকাশকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছিল। আদালত রিমান্ডের শুনানির দিন পরে ধার্য করার সিদ্ধান্ত দিয়ে আকাশকে জেলহাজতে পাঠিয়েছেন।