১৬ বছরের প্রবাসজীবন শেষে ড্রাগন চাষ, শুরুতে বাজিমাত জাফর সাদেকের
সৌদি আরবে দীর্ঘ ১৬ বছর গাড়ির সিট কাভার তৈরির কাজ সামলান মৌলভি জাফর সাদেক (৫৫)। কাজের ফাঁকে মুঠোফোনে ইউটিউবে দেখতেন ড্রাগন ফলের বাণিজ্যিক চাষ। মনে মনে ভাবতেন, প্রবাসজীবন ছেড়ে একদিন দেশে গিয়ে ড্রাগন চাষ করবেন। যে চিন্তা সেই কাজ। ২০২৪ সালের জুন মাসে দীর্ঘ প্রবাসজীবনের ইতি ঘটিয়ে ফিরে আসেন বাংলাদেশের টেকনাফে। গত বছরের ১ ডিসেম্বর টেকনাফের নতুন পল্লানপাড়ায় হেলাল উদ্দিন নামের এক ব্যাংক কর্মকর্তার কাছ থেকে ১০ বছরের জন্য বর্গা নেন ৩ কানি (৪০ শতকে ১ কানি) জমি।
শুরু হয় স্বপ্নের ড্রাগন চাষ। কয়েক মাসের মাথায় গাছে গাছে ধরতে থাকে ড্রাগন। ইতিমধ্যে ড্রাগনের বেচাবিক্রিও শুরু হয়েছে। এখন প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ জাফরের বাগানে ভিড় জমান, কেনেন ড্রাগন ফল। অবস্থা দেখে ড্রাগন চাষ বাড়ানোর চিন্তা করছেন সফল এই উদ্যোক্তা।
জাফর সাদেকের বাড়ি টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের ঝিনাপাড়া গ্রামে। একসময় এলাকার একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন। পরে জীবিকার তাগিদে তিনি পাড়ি জমান সৌদি আরবে। দীর্ঘ ১৬ বছরের প্রবাসজীবন কাটিয়েও সংসারের অভাব দূর করতে পারেননি। দেশে ফিরে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ খুঁজতে গিয়ে তিনি বেছে নেন কৃষিকে। আর সেই সিদ্ধান্তই বদলে দিয়েছে তাঁর জীবনের মোড়।
টেকনাফ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হুমায়ূন কবীর বলেন, বর্তমানে টেকনাফে প্রায় ১০ হেক্টর জমিতে ড্রাগন চাষ হচ্ছে। তবে প্রথমবারের মতো বড় পরিসরে বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন চাষের সাহসী উদ্যোগটি নিয়েছেন জাফর সাদেক। প্রথম ধাপে বাম্পার ফলন ঘটিয়ে বাজিমাত করেন এই প্রবাসী। কৃষি বিভাগের তত্ত্বাবধানে হওয়া জাফরের এই ড্রাগনবাগান সবার নজর কাড়ছে। ড্রাগন চাষ পদ্ধতি নিয়ে জাফরকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।
বাগানে ঢুকতেই চোখে পড়ে সারিবদ্ধ সবুজ গাছের ডালে থোকায় থোকায় ঝুলছে লাল ও হলুদ রঙের ড্রাগন ফল। কোথাও সদ্য ফোটা সাদা ফুল, কোথাও কাঁচা ফল, আবার কোথাও পাকার অপেক্ষায় টকটকে লাল ড্রাগন। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, সবুজের বুকে ঝলমল করছে অসংখ্য লাল বাতি।
চাষের পর বাগানেই বিক্রি
২০২৪ সালের জুন মাসে টেকনাফে ফিরে এসে ড্রাগন চাষের জমি খুঁজতে থাকেন জাফর সাদেক। নিজের ইউনিয়নে সাবরাং এলাকায় জমি না পেয়ে তিনি হাত বাড়ান পাশের ইউনিয়ন টেকনাফ সদরে। আবিষ্কার করেন পল্লানপাড়ায় কিছু পরিত্যক্ত জমি। জমির মালিক ব্যাংকার হেলাল উদ্দিনের সঙ্গে কথা বলে প্রতি কানি জমি ৫০ হাজার টাকায় দরে (বাৎসরিক) ৩ কানি জমি ১০ বছরের জন্য ইজারা নেন। মাঠের কাজ শেষ করে জমিতে রোপণ করেন ৩ হাজার ২০০টি ড্রাগন চারা। কয়েক মাসের মাথায় বাগানটি দাঁড়িয়ে যায়। প্রতিটি গাছে ধরেছে ৬-১২টি ফল। ইতিমধ্যে ড্রাগন ফল পাকতে শুরু করেছে। বেচা–বিক্রি হচ্ছে। টেকনাফের বিভিন্ন দোকানে বান্দরবান, খাগড়াছড়িসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আনা ড্রাগন ফল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২৮০-৩০০ টাকা। কিন্তু জাফর সাদেকের বাগানের তাজা ড্রাগন বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়।
এর কারণ জানতে চাইলে জাফর সাদেক বলেন, তাঁর বাগানের ড্রাগন কেনার জন্য পাইকারে অনেক ব্যবসায়ী ভিড় জমান, কিন্তু তিনি তাঁদের ড্রাগন বিক্রি করেন না। দোকানপাটে যেসব ফল চড়া মূল্যে বেচা–বিক্রি হয়, সব কটি ফরমালিনযুক্ত। তাঁর বাগানের ফলও পাইকারে বিক্রি হলে দোকানদারেরা সেই ফলে ফরমালিন মিশিয়ে বিক্রি করতে পারেন, তাতে তাঁর বদনাম হবে। অন্যদিকে নিজ এলাকার মানুষ ফরমালিনযুক্ত ফল খেয়ে অসুস্থ হবেন। তাই তিনি এলাকার সাধারণ মানুষজনকে বিষমুক্ত এবং কম দামে ড্রাগন ফল খাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন। তাতে মানুষজন খুশি হয়ে বাগান দেখতে আসছেন, অনেকে চাহিদামতো এক থেকে পাঁচ কেজি ফল কিনে খাচ্ছেন।
শুরুতেই বাজিমাত
বাগানে ঢুকতেই চোখে পড়ে সারিবদ্ধ সবুজ গাছের ডালে থোকায় থোকায় ঝুলছে লাল ও হলুদ রঙের ড্রাগন ফল। কোথাও সদ্য ফোটা সাদা ফুল, কোথাও কাঁচা ফল, আবার কোথাও পাকার অপেক্ষায় টকটকে লাল ড্রাগন। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, সবুজের বুকে ঝলমল করছে অসংখ্য লাল বাতি।
জাফর সাদেক বলেন, শুরুতে মনে শঙ্কা ও অনিশ্চয়তা কাজ করেছিল। ধৈর্য ও পরিশ্রমে সেই শঙ্কা দূর করে সফলতার মুখ দেখেন তিনি। বাগানের অধিকাংশ চারা থাইল্যান্ডের উচ্চফলনশীল ‘রেড ভেলভেট’ জাতের ড্রাগন। টেকনাফের মাটি ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় গাছগুলো দ্রুত বেড়ে ওঠে। এপ্রিল মাসে গাছে ফুল ফোটা শুরু হয়। মে মাসের মাঝামাঝিতে ফল পাকতে শুরু করে। টানা প্রায় আট মাস ফল পাওয়া যাবে।
দেখা গেছে, প্রতি কেজি ড্রাগ নফল বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়। প্রতিটি গাছ থেকে গড়ে আড়াই কেজি ফল পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিটি ড্রাগনের ওজন ২৭০-৩২০ গ্রাম। ইতিমধ্যে ৩ লাখ টাকার ড্রাগন বিক্রি করেছেন জাফর সাদেক। তিনি বলেন, গাছে আরও লাখ টাকার ফল রয়েছে।
বাগান গড়ে তুলতে মোট ৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছে জাফর সাদেকের। তিনি বলেন, এটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। বিনিয়োগের সব টাকা এক বছরে তুলে আনা সম্ভব নয়। তবে বাগানটি ধরে রাখা গেলে আগামী বছর বিনিয়োগের সব টাকা উঠে আসতে পারে। পরের বছর থেকে মুনাফা অর্জন করা সম্ভব হবে।
বাগান গড়ে তুলতে মোট ৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছে জানিয়ে জাফর সাদেক বলেন, এটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। বিনিয়োগের সব টাকা এক বছরে তুলে আনা সম্ভব নয়। তবে বাগানটি ধরে রাখা গেলে আগামী বছর বিনিয়োগের সব টাকা উঠে আসতে পারে। পরের বছর ধরে মুনাফা অর্জন করা সম্ভব হবে।
জাফর সাদেক বলেন, ড্রাগনবাগানের পরিচর্যা করা হয় প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে। বিশ্বস্ত ও দক্ষ কর্মীর অভাবে অধিকাংশ কাজ তাঁকেই সামলাতে হয়। ফলের আকার বৃদ্ধি কিংবা রোগবালাই দমনের জন্য কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করেন না। উৎপাদিত ড্রাগন ফলের স্বাদ, পুষ্টিগুণ ও গুণগত মান বজায় থাকে। আয় বাড়াতে দেড় লাখ টাকায় বাগানের ভেতরের জমিতে সৃজন করেন সিডলেস লেবু, সবুজ মাল্টা ও বারোমাসি পেয়ারার চাষ। এসব ফল বিক্রি করে প্রতি মাসে আয় করছেন প্রায় ২০ হাজার টাকা। পাশাপাশি বাড়ির ছাদে গড়ে তোলেন এক হাজার মুরগির একটি পোলট্রি খামার। জাফর বলেন, শিগগিরই খামারের মুরগি বাজারে বিক্রির উপযোগী হয়ে উঠবে।
বাগানে ফল কিনতে আসা স্থানীয় ব্যবসায়ী রাশেদুল ইসলাম বলেন, টেকনাফে বড় পরিসরে আর কোনো ড্রাগন চাষ চোখে পড়ে না। ইচ্ছাশক্তি, পরিকল্পনা ও পরিশ্রম থাকলে যেকোনো মানুষ জাফর সাদেকের মতো ভাগ্য বদলে নিতে পারেন।
টেকনাফ সরকারি কলেজের প্রভাষক আবু তাহের বলেন, জাফর সাদেকের বাগানের ড্রাগন তুলনামূলক ছোট হলেও ভেতরে লাল টকটকে। প্রাকৃতিক উপায়ে উৎপাদিত হওয়ায় এসব ফলের স্বাদ বেশি এবং দীর্ঘদিন সতেজ থাকে। জাফরের ড্রাগন ফলের চাষ এলাকায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে দিয়েছে। ভালো ফল উৎপাদন হওয়ায় অনেকে ড্রাগন চাষে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তরুণদের জন্য বিকল্প আয়ের পথ হিসেবে ড্রাগন চাষ বাড়ানো গেলে এলাকার মাদক চোরাচালানসহ অপরাধ কর্মকাণ্ড কমে আসবে।