ভাদ্র মাসের দুপুরেও কড়া রোদ। এর মধ্যেই তিতাস নদের দুই পাড়ে লাখো মানুষের উল্লাস। থেমে থেমে হর্ষধ্বনিতে মুখর চারপাশ। সঙ্গে বাঁশি-করতালের তাল ও বইঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। বাহারি পোশাক পরা মাল্লাদের কোরাস ‘হেইও রে, হেইও’।

এভাবেই আজ রোববার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ আনন্দ-উচ্ছ্বাসে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ উপভোগ করেছেন। তিতাস নদের ব্রাহ্মণবাদিয়া শহরের শিমরাইলকান্দি গাঁওগ্রাম পয়েন্ট থেকে মেড্ডা সরকারি শিশু পরিবার পর্যন্ত দেড় কিলোমিটার এলাকায় এ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।

বিজয়নগর উপজেলার বুধন্তি ইউনিয়নের বিন্নিঘাট থেকে ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সফিক মিয়া প্রায় ৬২ ফুট দৈর্ঘ্যের নৌকায় ৭৫ জন মাল্লা নিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। ঐতিহ্য ধরে রাখতেই বাইচে অংশ নিয়েছেন জানিয়ে ইউপি সদস্য মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘আট লাখ টাকায় নৌকা কিনেছি। আরও অনেক খরচ হয়েছে।’

সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের ক্ষমতাপুরের বাচ্চু মিয়া দুই বছর পর প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে এসেছেন। তাঁর নৌকাটি প্রায় ৮০ ফুট দৈর্ঘ্যের। ৭০ জন মাল্লা নিয়ে বাইচে অংশ নেওয়া বাচ্চু মিয়া বলেন, ‘প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে ৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকায় নৌকাটি কিনেছি। নৌকায় রং করা, বইঠা সাজানো ও মাল্লাদের পোশাক বাবদ আরও অনেক টাকা খরচ হয়েছে।’

দারাজ বাংলাদেশ, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড ও ইউনিভার্সেল মেডিকেল সার্ভিসেস লিমিটেডের আয়োজনে এর সার্বিক সহযোগিতায় ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসন।

সারা দিন তিতাসপাড়ে অবস্থান করে দেখা যায়, সকাল থেকে জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের নৌকা নিয়ে উৎসাহী দর্শকেরা তিতাসের দুই পাড়ে হাজির হতে থাকেন। বেলা একটায় নৌকাবাইচ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও আগেই নৌকায় লাখো দর্শক অবস্থান নেন। প্রধান অতিথির বক্তব্য শেষে বেলা সাড়ে তিনটায় নৌকাবাইচ শুরু হয়। এ সময় বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে পুরো এলাকা মুখর হয়ে ওঠে।

বাহারি পোশাক পরা মাল্লাদের ‘হেইও রে, হেইও’ কোরাস বাড়িয়ে দেয় দর্শকদের উল্লাস
ছবি: প্রথম আলো

এর আগে বেলা সোয়া তিনটার দিকে শহরের শিমরাইলকান্দি শ্মশানঘাট থেকে প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর ও বিজয়নগর) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী। জেলা প্রশাসক মো. শাহ্গীর আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান বক্তব্য দেন।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, প্রতিযোগিতায় জেলার সদরের চারটি, বিজয়নগর উপজেলার পাঁচটি, সরাইলের একটি, নবীনগরের একটি ও আশুগঞ্জ উপজেলার দুটি অর্থাৎ মোট ১৩টি নৌকা প্রথম চারটি ধাপে অংশ নেয়। প্রতিটি পর্যায় থেকে বিজয়ী হওয়া একটি করে মোট চারটি নৌকা চূড়ান্ত প্রতিযোগিতার জন্য বাছাই করা হয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদে প্রথম কবে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়েছে—এর সঠিক সাল–তারিখ জানা যায়নি। তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক ওয়ারসের ও ত্রিপুরা জেলা গেজেটিয়ারের বর্ণনায় ১৯০৮ সালে মনসাপূজা উপলক্ষে বাংলা তারিখ অনুযায়ী পয়লা ভাদ্রে তিতাসে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হওয়ার উল্লেখ পাওয়া যায়।

তিতাসে যত দিন পানি থাকবে, তত দিন এই আয়োজন থাকবে মন্তব্য করে উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী বলেন, নৌকাবাইচ দেশের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী উৎসব। ধর্মান্ধতাকে পেছনে ফেলে এই আয়োজন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক মো. শাহ্গীর আলম বলেন, সুশৃঙ্খলভাবে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ প্রতিযোগিতা প্রতিবছর অব্যাহত থাকবে।

প্রতিযোগিতায় সদর উপজেলার পক্ষে অংশ নেওয়া হবিগঞ্জের আবদুল আলীর নৌকা প্রথম ও জাকির হোসেনের নৌকা দ্বিতীয় ও আশুগঞ্জের পক্ষে হবিগঞ্জের সেলিম মিয়ার নৌকা তৃতীয় হয়। প্রথম পুরস্কার এক লাখ টাকা, দ্বিতীয় পুরস্কার ৬০ হাজার টাকা ও তৃতীয় পুরস্কার ৩০ হাজার দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাকি নৌকাগুলোকে ২০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়।