ছয় সন্তানকে বড় করেছেন, ৯৫ বছর বয়সে বাবার ঠাঁই হলো গাছতলায়

বৃদ্ধ শামসুল ইসলামকে বাড়ি থেকে বের করে একটি গাছতলায় রেখে গেছেন ছেলেমেয়েরা। মঙ্গলবার সকালে কোটালীপাড়া উপজেলার উত্তর হিরন গ্রামেছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলোকে নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে পেতে হলেএখানে ক্লিক করুন

নিজের ঘাম, শ্রম আর ভালোবাসা দিয়ে ছয় সন্তানকে বড় করেছেন শামসুল হক মোল্লা। স্বপ্ন দেখেছেন জীবনের শেষ দিনগুলোতে সন্তানদের সান্নিধ্যে কাটাতে পারবেন। কিন্তু সেই বার্ধক্যেই আজ তিনি সন্তানদের কাছে বোঝা হয়ে গেছেন। ছয় সন্তানের কারও ঘরেই তাঁর আশ্রয় মেলেনি। শেষ পর্যন্ত তাঁর ঠাঁই হয়েছে বাড়ির পাশের একটি গাছতলায়।

শামসুল হক মোল্লার বাড়ি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার উত্তর হিরন গ্রামে। তাঁর দুই ছেলে ও চার মেয়ে। বড় ছেলে আজিজুল মোল্লা পেশায় ফেরিওয়ালা। ছোট ছেলে রিয়াজুল মোল্লা বাসের চালকের সহকারী। চার মেয়ের মধ্যে তিনজনের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট মেয়ে শারীরিক প্রতিবন্ধী।

আজ মঙ্গলবার সকালে দুই ছেলে ও তাঁদের স্ত্রীরা তাঁকে বাড়ির অদূরে একটি গাছের নিচে রেখে আসেন। এ ঘটনা জানাজানির পর এলাকায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

আমি এখন কোথায় যাব, কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না। সারা জীবন কষ্ট করে ওদের (ছেলেমেয়ে) বড় করলাম। তাদের কাছে এখন আমি বোঝা হয়ে গেছি। এখন আল্লাহ যা করেন, তা-ই হবে।
বৃদ্ধ শামসুল হক

বৃদ্ধ শামসুল হক জানান, তাঁর বয়স এখন ৯৫ বছর। তিনি বলেন, ‘আমি এখন কোথায় যাব, কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না। সারা জীবন কষ্ট করে ওদের (ছেলেমেয়ে) বড় করলাম। তাদের কাছে এখন আমি বোঝা হয়ে গেছি। এখন আল্লাহ যা করেন, তা-ই হবে।’

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েক বছর আগে জমি বিক্রি করে হজ করতে যান শামসুল হক। তখন বাকি জমিজমা সন্তানদের মধ্যে ভাগ করে দেন তিনি। এখন সন্তানেরা নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। গত কয়েক দিন বড় মেয়ে মায়া বেগমের বাড়িতে ছিলেন শামসুল হক। অসুস্থ স্বামী ও প্রতিবন্ধী ছোট বোনকে নিয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে উল্লেখ করে মঙ্গলবার সকালে বাবাকে ভাইদের বাড়িতে নিয়ে আসেন মায়া। কিন্তু দুই ছেলে ও তাঁদের স্ত্রীরা তাঁকে বাড়িতে আশ্রয় দেননি। তাঁকে বাড়ির পাশে একটি গাছতলায় রাখা হয়।

জমিজমা লিখে নিয়ে এখন সন্তানেরা বাবাকে আশ্রয় দিচ্ছে না। তিনি যদি সন্তানদের জমি লিখে না দিতেন, তাহলে হয়তো এমন অবস্থা তৈরি হতো না। সন্তানদের এমন আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়।
প্রতিবেশী এক গৃহবধূ

বড় মেয়ে মায়া বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী অসুস্থ। তারপর আমার বাড়িতে প্রতিবন্ধী ছোট বোন কাজুলীও থাকে। সব মিলিয়ে আমার একার পক্ষে বাবাকে দেখাশোনা করা কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ জন্য আব্বাকে বাড়িতে দিয়ে আইছি।’

এ বিষয়ে কথা বলতে শামসুল হকের দুই ছেলে আজিজুল ও রিয়াজুলের বাড়িতে গিয়েও তাঁদের পাওয়া যায়নি। তাঁদের স্ত্রীরাও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

মেজ মেয়ে সাবিনা বেগম বলেন, ‘জমি বিক্রি করে আব্বা আমাদের চার বোনকে চার লাখ টাকা করে দিয়েছেন। দুই ভাইকে নগদ টাকাসহ আট কাঠা করে জমি দিয়েছেন। এখন বোনেরা কেন আব্বার দেখাশোনা করব? আমার দুই ভাই আছেন, তাঁরা আব্বার দেখাশোনা করবেন।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিবেশী এক গৃহবধূ প্রথম আলোকে বলেন, জমিজমা লিখে নিয়ে এখন সন্তানেরা বাবাকে আশ্রয় দিচ্ছে না। তিনি যদি সন্তানদের জমি লিখে না দিতেন, তাহলে হয়তো এমন অবস্থা তৈরি হতো না। সন্তানদের এমন আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়।

যোগাযোগ করলে কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফ-উল-আরেফীন বিকেল সাড়ে চারটার দিকে প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনা জানার পর এখন তিনি ঘটনাস্থলে যাচ্ছেন। শামসুল হকের সন্তানেরা যদি তাঁর দেখাশোনা না করেন, তাহলে পিতামাতার ভরণপোষণ আইনানুযায়ী তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পরে সন্ধ্যা সাতটার দিকে ইউএনও বলেন, তিনি শামসুল হকের ছেলেমেয়েদের নিয়ে তাঁর কার্যালয়ে বসেছেন। এ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।