বাবার একটাই চাওয়া, যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেন বৃষ্টির লাশ খুঁজে বের করে

নাহিদা সুলতানা বৃষ্টিছবি: পরিবারের সৌজন্যে

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে হত্যার শিকার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির মরদেহ যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ এখনো খুঁজে পায়নি বলে জানিয়েছেন তাঁর বাবা জহির উদ্দিন আকন ওরফে দিল মোহাম্মদ। তাঁর একটাই চাওয়া, যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেন মেয়ের লাশ খুঁজে বের করে এবং বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়।

নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের চর গোবিন্দপুর এলাকায়। তাঁর বাবা জহির উদ্দিন দুই যুগের বেশি সময় ধরে রাজধানীর মিরপুরে পরিবার নিয়ে থাকেন। তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানিতে কর্মরত রয়েছেন। তাঁর মেয়ে নাহিদা সুলতানা যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের টাম্পায় ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) পিএইচডির শিক্ষার্থী ছিলেন।

আজ রোববার সকালে নিহত বৃষ্টির বাবা জহির উদ্দিন আকন প্রথম আলোকে বলেন, ‘মেয়েটাকে আমি শেষবারের মতো দেখতে চাই। বৃষ্টির মা, ভাই সবাই খুব মন খারাপ করে আছে। কান্নাকাটি করছে। সবার মন মরা। এ অবস্থায় আমাদের একটাই আকুতি। ওর মরদেহটা যেন যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী খুঁজে বের করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। আমরা এর বাইরে আর কিছু চাই না।’

জহির উদ্দিন আকন বলেন, ‘মেয়ের লাশ পাওয়ার খবরের আশায় গতকাল শনিবার রাত জেগে অপেক্ষা করেছি। যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ আর ফোন করেনি। তাদের ফোন করার কথা ছিল। পরে আমরা যোগাযোগ করে জেনেছি, তারা (পুলিশ) এখনো বৃষ্টির মরদেহ খুঁজতে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। পুলিশ লিমনের বাসা থেকে একটি দেহের খণ্ডিত অংশ পেয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এটি বৃষ্টির দেহের অংশ। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ স্পষ্ট করে কিছু জানায়নি। আমাদের সঙ্গে নিয়মিত বৃষ্টির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশি দূতাবাস, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে পুলিশসহ যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশি কমিউনিটি যোগাযোগ রাখছে। আশ্বস্ত করেছে, বৃষ্টির হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতসহ তার লাশটি খুঁজে পেতে তারা সহযোগিতা করবে। এখন অপেক্ষা করা ছাড়া কিছুই করতে পারছি না।’

আরও পড়ুন

বৃষ্টির পরিবারের সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার মিরপুরের নাহার একাডেমি হাইস্কুল থেকে ২০১৪ সালে জিপিএ-৫ (গোল্ডেন এ প্লাস) নিয়ে এসএসসি পাস করেন নাহিদা সুলতানা। পরে শহীদ বীর উত্তম লে. আনোয়ার গার্লস কলেজ থেকেও জিপিএ-৫ (গোল্ডেন এ প্লাস) নিয়ে এইচএসসি পাস করেন। এরপর নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক শেষ করে ঢাকার বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হন। তবে স্নাতকোত্তর শেষ করার আগেই ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় ফুল স্কলারশিপে পিএইচডি করার সুযোগ পেলে ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট ঢাকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান বৃষ্টি।

নিহত বৃষ্টির চাচা দানিয়াল আকন পরিবার নিয়ে মাদারীপুরে গ্রামের বাড়িতে থাকেন। পেশায় তিনি একজন কৃষক। ভাতিজি বৃষ্টিকে নিয়ে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘বৃষ্টি যে আমাদের ছেড়ে এভাবে চলে যাবে, তা আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না। ওরা (বৃষ্টির পরিবার) বছরে একবার বড়জোড় দুবার দেশের বাড়িতে আসত। মেয়েটা ছোট থেকেই ঢাকায়। আমার ভাইয়ের মেয়ে ও ছেলে—দুজনই পড়ালেখায় খুবই ভালো। এলাকায় ওদের নিয়ে সবাই গর্ব করত। বৃষ্টির মারা যাওয়ার কথা কেউ মানতে পারছে না। ওর জন্য সবাই কান্না করে যাচ্ছে। যারা বৃষ্টিকে হত্যা করেছে, তাদের বিচার চাই। আল্লাহ যেন তার বিচার করে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মর্জিনা আক্তার বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরা অবগত রয়েছি। নিহত বৃষ্টির পরিবারের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করেছি। একটি আবেদন লাগবে। পরে আমরা প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে বৃষ্টির লাশ আনাসহ যাবতীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পাঠিয়ে দেব। আশা করছি, তাঁর লাশটি পুলিশ খুঁজে পেলেই এই কার্যক্রম হাতে নেওয়া হবে।’

যুক্তরাষ্ট্রে ১৭ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ হন লিমন ও বৃষ্টি নামের দুই শিক্ষার্থী। দুজনই ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার পিএইচডি শিক্ষার্থী। ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন লিমন। অন্যদিকে নাহিদা পিএইচডি করছিলেন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে। নিখোঁজ হওয়ার আগের দিন বৃহস্পতিবার দুজনকে সর্বশেষ ক্যাম্পাসে দেখা গিয়েছিল।

গত শুক্রবার নিখোঁজ শিক্ষার্থী জামিলের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ। ফ্লোরিডার হিলসবরোর স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এক সংবাদ সম্মেলনে ফ্লোরিডার ট্যাম্পার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধারের কথা জানায়। তাঁদের নিখোঁজের ঘটনায় হিশাম সালেহ আবুঘরবেহ নামের ২৬ বছরের আমেরিকার এক নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে স্থানীয় পুলিশ। তিনি জামিলের সঙ্গে একই কক্ষে থাকতেন। তবে হিশামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাঁর পারিবারিক বাড়ি থেকে।