চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের সব কাজ শেষ হতে আরও দেড় থেকে দুই বছর লাগবে। এখনো তিনটি খালের কাজ শেষ হয়নি। এখন কাজ চললেও চলতি বছরে তা শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম। ভূমি অধিগ্রহণ, স্থাপনা অপসারণ ও প্রকল্প বরাদ্দ জটিলতায় এসব খালের কাজ আটকে ছিল। ইতিমধ্যে এসব জটিলতা নিরসন হয়েছে।
চট্টগ্রাম নগরের হিজড়া খাল, জামালখান খাল ও মিরজা খালের কিছু কিছু অংশে কাজ হয়েছিল। তবে বেশির ভাগ অংশে খাল প্রশস্ত করা এবং প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণ বন্ধ ছিল। তবে শুষ্ক মৌসুমে খালগুলোয় আবার পুরোদমে কাজ শুরু হয়েছে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ শীর্ষক এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। ২০১৭ সালের আগস্টে এই প্রকল্পের অনুমোদন হয়। সাড়ে আট বছরে প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ৯০ শতাংশ।
সিডিএর তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত প্রকল্পের আওতায় থাকা ২১টি খালের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়েছে। তিনটি ছাড়া অন্য খালগুলোর কাজও প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি হয়েছে।
গত বছর মাত্র ২৯টি স্থানে পানি জমেছিল। সর্বোচ্চ ২ থেকে ৪ ঘণ্টার মধ্যে পানি নেমে যায়। চলতি বছরে ১০টি স্থানে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পানি জমলেও তা এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে নেমে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
জলাবদ্ধতা প্রকল্পের কাজ শুরুর সময় নগরের অন্তত ১১৩টি এলাকায় সর্বোচ্চ ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা পর্যন্ত পানি জমে থাকত। তবে পরে ধীরে ধীরে জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকা ও পানি জমে থাকার সময় কমে আসে। গত বছর মাত্র ২৯টি স্থানে পানি জমেছিল। সর্বোচ্চ ২ থেকে ৪ ঘণ্টার মধ্যে পানি নেমে যায়। চলতি বছরে ১০টি স্থানে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পানি জমলেও তা এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে নেমে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
অর্থায়ন জটিলতার নিরসন
শুরুতে এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। পরে তা বাড়িয়ে ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা করা হয়। সংশোধিত প্রকল্পে বর্ধিত ব্যয়ের ৭৫৩ কোটি টাকা ঋণ এবং আরও ৭৫৩ কোটি টাকা নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয়ে শর্ত দিয়েছিল সিডিএকে। তবে ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য নেই জানিয়ে তা অনুদান হিসেবে দেওয়ার জন্য চিঠি দিয়েছিল সিডিএ। তবে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার রাজি হয়নি। এতে হিজড়া খালের কাজ আটকে গিয়েছিল।
নগরের নাসিরবাদ আবাসিক এলাকায় খালের প্রশস্তকরণ এবং শুলকবহরে সিডিএ অ্যাভিনিউয়ের ওপর সেতুর নির্মাণকাজ চলছে। গত বছর শুরু হলেও বর্ষা মৌসুমের কারণে মাঝখানে বন্ধ ছিল। এখন আবার তা পুরোদমে কাজ হচ্ছে।
তবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ৬৫০ কোটি টাকা অনুদান হিসেবে দিতে রাজি হয়েছে। এখন ঋণ হিসেবে নিতে হচ্ছে ১০৩ কোটি টাকা। এর পাশাপাশি নিজস্ব তহবিল থেকে ৭৫৩ কোটি টাকা খরচ করতে হবে সিডিএকে।
সিডিএ সূত্র জানায়, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় এখন পর্যন্ত ৫টি খালের মুখে জোয়ার প্রতিরোধক ফটকের (টাইডাল রেগুলেটর) নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। ১৫টি বালুর ফাঁদ বা সিল্ট ট্র্যাপ নির্মাণ করা হয়েছে। সেতু ও কালভার্ট করা হয়েছে ১০৮টি। ৫৬৪ কিলোমিটার নালা সম্প্রসারণ, মেরামত ও পরিষ্কার করা হয়েছে গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত।
প্রশস্ত হচ্ছে ৩ খাল
অর্থায়ন জটিলতা দূর হওয়ায় বর্তমানে তিনটি খালের কাজ পুরোদমে চলছে। এগুলোর মধ্যে হিজড়া খালের প্রশস্ততা হবে ২০ থেকে ৩২ ফুট পর্যন্ত। আগে ছিল ১২ থেকে ৩০ ফুট পর্যন্ত। তবে অধিকাংশ স্থানে ছিল ১০ থেকে ১৫ ফুট পর্যন্ত। এখন আগের তুলনায় গড়ে ১০ থেকে ২০ ফুট পর্যন্ত প্রশস্ত হচ্ছে এই খাল।
নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার লম্বা হিজড়া খালের গুরুত্ব অনেক বেশি। নগরের এম এম আলী সড়ক হয়ে প্রবর্তক মোড়, পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকা, কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকা, চকবাজার হয়ে এই খাল চাক্তাই খালে মিলিত হয়েছে। নগরের জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকাগুলোর মধ্যে এসব এলাকা অন্যতম।
এই খালের জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছিল ৬৩১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে রয়েছে—ভূমি অধিগ্রহণ, স্থাপনার ক্ষতিপূরণ, প্রতিরোধ ওয়াল নির্মাণ, খালের মাটি খনন ও গভীরতা বাড়ানো, পিসি গার্ডার ব্রিজ তৈরি ও আরসিসি কালভার্ট নির্মাণ।
তবে এই অর্থ বরাদ্দ পাওয়া নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। এ জন্য কিছু অংশে কাজ শেষ হলেও অধিকাংশ জায়গায় কাজ থেমে যায়। বিশেষ করে পাঁচলাইশ ও কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকায় জমি অধিগ্রহণ ও স্থাপনার ক্ষতিপূরণের বরাদ্দ পাওয়া নিয়ে এ সংশয় তৈরি হয়েছিল। তবে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে তা নিরসন হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, নগরের প্রবর্তক মোড়, কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকা ও পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকায় হিজড়া খালের দুই পাশের বিভিন্ন স্থাপনা অপসারণের কাজ চলছে। কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকার সামনে সেতুর নির্মাণকাজের জন্য সড়কের এক পাশ বন্ধ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণের জন্য অস্থায়ী বাঁধ তৈরি করা হচ্ছে খালের ভেতরে। এতে আশপাশের এলাকায় সাময়িকভাবে পানি জমে দুর্ভোগের সৃষ্টি হচ্ছে।
নগরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মিরজা খালের প্রশস্ততা হতে যাচ্ছে ৩১ থেকে ৫৬ ফুট পর্যন্ত। আগে এই খালের প্রশস্ততা ছিল ১৫ থেকে ৪৫ ফুট। নগরের ২ নম্বর গেট এলাকা থেকে শুরু হওয়া প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ এই খাল শীতল ঝরনাতে মিশেছে। গত মঙ্গলবার নগরের নাসিরবাদ আবাসিক এলাকায় ১২ তলা একটি ভবনের অংশ বিশেষ অপসারণ করে সিডিএ। এই ভবনের একাংশ খালের জায়গা দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে বলে সিডিএ জানায়।
নগরের নাসিরবাদ আবাসিক এলাকায় খালের প্রশস্তকরণ এবং শুলকবহরে সিডিএ অ্যাভিনিউয়ের ওপর সেতুর নির্মাণকাজ চলছে। গত বছর শুরু হলেও বর্ষা মৌসুমের কারণে মাঝখানে বন্ধ ছিল। এখন আবার তা পুরোদমে কাজ হচ্ছে।
নগরের জামালখান খালের আগে প্রশস্ততা ছিল ৯ থেকে ২০ ফুট। এখন প্রশস্ততা বাড়িয়ে করা হচ্ছে সর্বনিম্ন ১৬ থেকে সর্বোচ্চ ২৮ ফুট। নগরের জামালখান ও লাভলেইন এলাকায় খালের প্রতিরোধ দেয়ালের কাজ চলমান রয়েছে।
জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আহম্মদ মঈনুদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ পুরোদমে চলছে। এখন চলমান থাকা তিনটি খালের কাজ শেষ করতে সাত থেকে আট মাস লাগবে। তবে একটানা কাজ করা যাবে না। কেননা বর্ষা মৌসুমের কারণে এপ্রিলের দিকে আবার কাজ বন্ধ করতে হবে। এরপর শুষ্ক মৌসুমের অপেক্ষায় থাকতে হবে। এই কারণে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে আগামী বছর জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় লাগবে। প্রকল্পের কাজ চলাকালে জনদুর্ভোগ সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন।