আমরা বিভক্তির বাংলাদেশ চাই না: শফিকুর রহমান

বগুড়া শহরের আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। শনিবার দুপুরেছবি: প্রথম আলো

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা দুর্নীতিমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত, আধিপত্যবাদমুক্ত, ন্যায় ও ইনসাফের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই। আল্লাহ–তাআলার ইচ্ছায়, তাঁর সাহায্যে, জনগণের ভালোবাসায় ও জনগণের ভোটে জামায়াতে ইসলামী নির্বাচিত হলে সবাইকে নিয়েই আগামী পাঁচ বছর দেশ চালাতে চাই। আমরা বিভক্তির বাংলাদেশ চাই না। আমরা ঐক্যের বাংলাদেশ চাই।’

আজ শনিবার দুপুরে বগুড়ার ঐতিহাসিক আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে ১০–দলীয় ঐক্যের নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের আমির এ কথাগুলো বলেন। পরে তিনি বগুড়ার বিভিন্ন আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে তাঁদের হাতে দলীয় প্রতীক তুলে দেন। এরপর শেরপুরের জনসভায় যোগ দেন জামায়াতের আমির।

জনসভায় শফিকুর রহমান বলেন, ‘এই বগুড়া উত্তরবঙ্গের রাজধানীখ্যাত। সাতমাথা সারা উত্তরবঙ্গকে যুক্ত করেছে। ইনশা আল্লাহ আল্লাহ–তাআলা যদি আমাদের দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দেন, আমরা এই বগুড়াকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করব। এই বগুড়া একসময় শিক্ষা-শিল্পে সারা উত্তরবঙ্গের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছিল। এর ঐতিহ্য শত শত বৎসরের। বহু জায়গায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে, আজও বগুড়ায় একটা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠল না। আল্লাহ যদি আমাদের সেই সুযোগ দেন, এইটা আমরা বাস্তবায়ন করব ইনশা আল্লাহ।’

জামায়াতের আমির বলেন, ‘এটা কোনো দয়ার দান নয়; জামায়াতে ইসলামী তার দলীয় তহবিল থেকে এটা করবে না। আপনাদের যে টাকা, সেই টাকা দিয়েই কিন্তু এটা বাস্তবায়ন করা হবে। বলবেন, এত টাকা আমরা দিতে পারি? হ্যাঁ, দিচ্ছেন তো আপনারা। আপনাদের টাকাটা ঝুড়িতে রাখতেছেন আর ঝুড়ির তলা না থাকার কারণে বাইরে চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে সাড়ে ১৫ বছরে পাচার করা হয়েছে। আমরা চেষ্টা করব, পেটের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে ওই টাকা বের করে আনতে। এটা জনগণের টাকা, জনগণের জন্য উন্নয়ন খাতে এটা এসে যুক্ত হবে ইনশা আল্লাহ। দুই নম্বর—সুদের জট কেটে দেওয়া হবে আর রাষ্ট্রের টাকা চুরি করতে দেওয়া হবে না।’

শফিকুর রহমান আরও বলেন, ‘চাঁদার জ্বালায় অতিষ্ঠ জনগণ। এই চাঁদার কারণে কৃষক তার পণ্যের ন্যায্য মূল্য পায় না; এই চাঁদার কারণে ভোক্তা ন্যায্যমূল্যে সে শাকসবজি কিনতে পারে না। চাঁদাবাজরা মাঝখানে ভাগ বসায়া দেয়, এর ভার পড়ে গিয়ে জনগণের ঘাড়ে। জুলাই শহীদদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে চাঁদাবাজমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে।’ তিনি বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী নির্যাতিত একটা মজলুম দল। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত একটা দল। জামায়াতের ইসলামীর কেউ গিয়ে মুদিদোকানির কাছে, রাস্তার পাশে বসা হকারের কাছে, ফকিরের কাছে চাঁদা চায়নি। যারা এত নির্যাতিত হওয়ার পরও নিজের হাতকে পরিচ্ছন্ন রাখতে পেরেছে, তাদের হাতেই আগামীর পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়ে উঠবে ইনশা আল্লাহ।’

জামায়াতের আমির বলেন, ‘একটা দল সরকার আসার আগে ১০ টাকা কেজি দরে চাল খাওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কেউ ১০ টাকা কেজি দরে চাল কিনতে পারেনি। অতীতে জনগণকে যেসব ধোঁকা দেওয়া হয়েছে, ওই সব ধোঁকা আর বাংলাদেশের জনগণ দেখতে চায় না। আমরা জনগণের জন্য যা করব, তা আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি থেকে নয়; জনগণের অর্থের ভান্ডার থেকে সততার সঙ্গে আমরা জনগণের জন্য কাজ করব।’

নারীদের ঘরে-বাইরে নিরাপত্তা নিশ্চিতের অঙ্গীকার করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘মায়েদের ইজ্জতের মূল্য জীবনের চেয়ে বেশি। মায়েদের কোনো অপমান আমরা বরদাস্ত করব না। কোনো লম্পটের জায়গা বাংলাদেশের জমিনে হবে না। এই ব্যাপারে আমাদের জিরো টলারেন্স। মায়েরা ঘরে থাকবেন নিরাপদে, রাস্তায় বের হয়ে নিরাপদে চলাফেরা নিশ্চিত করা সরকারের অঙ্গীকার এবং দায়িত্ব। তাঁরা নির্ভয়ে নিঃসংকোচে প্রশান্তি নিয়ে স্বস্তির সঙ্গে দেশ গড়ার কাজে পুরুষের পাশাপাশি অবদান রাখবেন।’

জামায়াতের আমির বলেন, ‘আমরা যুবকদের বেকার ভাতা দিতে পারব না। বেকার ভাতা দিয়ে অপমানিত করতে চাই না। বেকার ভাতা দিয়ে বাংলাদেশকে বেকারের ফ্যাক্টরি বানাতে চাই না। আমরা প্রত্যেকটি যুবকের হাতকে দেশ গড়ার কারিগরের হাতে পরিণত করতে চাই। শিক্ষার পাট চুকানোর সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষিত বেকারদের মর্যাদাপূর্ণ কাজ দিতে চাই। তাঁরা দক্ষ হয়ে দেশকে সেবা দেবে, দক্ষ হয়ে বিদেশে গিয়ে মর্যাদার সঙ্গে আয় উপার্জন করবে।’

‘কোনো দেশ প্রভু হয়ে আসলে বরদাস্ত করব না’

শেরপুরের মহিপুর খেলার মাঠে আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতা দেন শফিকুর রহমান। তিনি বেলা ২টা ১৭ মিনিটে মঞ্চে ওঠেন। পরে ১১ মিনিট বক্তৃতা দেন। জামায়াতের আমির বলেন, ‘হ্যাঁ ভোটের মানেই হচ্ছে কারও চোখ রাঙানিকে পরোয়া না করা। সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব চাই। কিন্তু কেউ আমাদের প্রভু হয়ে আসুক, তা আমরা বরদাস্ত করব না। বাংলাদেশের মানুষ ভাঙবে, কিন্তু মচকাবে না। অন্যায়ের কাছে মাথানত করবে না, আধিপত্যবাদকে আর মেনে নেবে না। আধিপত্যবাদকে আমাদের সন্তানেরা জুলাইয়ে লাল কার্ড দেখিয়েছে; এটা স্থায়ী লাল কার্ড। এই কার্ড আর সবুজ হবে না কখনো, এমনকি হলুদ হবে না।’

শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা কথা দিচ্ছি, আপনাদের ভোটে আল্লাহ–তাআলা যদি আমাদের মেহেরবানি করে নির্বাচিত করেন, সরকার গঠনের সুযোগ দেন, আল্লাহর কসম—জনগণের একটা টাকার ওপরে আমরা হাত বসাব না। আমরা চাঁদাবাজদের অস্তিত্ব বাংলাদেশের ৫৬ হাজার বর্গমাইলের ওপর সহ্য করব না। মহান আল্লাহ যদি আমাদের সুযোগ দেন, সব পর্যায়ের দুর্নীতিকে মাটির নিচে আমরা গেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করব।’

ন্যায়বিচার নিয়ে জামায়াতের আমির বলেন, ‘আমরা কথা দিচ্ছি, বিচার আর টাকার বিনিময়ে বিক্রি হবে না। ন্যায়বিচার সবার জন্য নিশ্চিত করা হবে। তার পেশা কী, বয়স কী, ধর্ম কী—আদালত এটা দেখবে না। আদালত দেখবে সে একজন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ কি না, সে মজলুম কি না? যদি ক্ষতিগ্রস্ত এবং মজলুম হয়, আদালত অবশ্যই তার পক্ষে রায় দেবে।’

‘আমরা যদি সত্য থেকে হেলে যাই, আমাদেরও ছাড় দেবেন না’—সাংবাদিকদের প্রতি এমন আহ্বান জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘তবে আপনাদের কাছে আমাদের অনুরোধ, সাদাকে সাদা বলবেন, কালোকে কালো বলবেন। সাদার গায়ে কোনো কালো প্রলেপ লাগাবেন না এবং কোনো কালোকে গোপন করবেন না। তাহলেই দেশ ভালো চলবে এবং আপনাদের অবদানের জন্য দেশবাসী আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে। আমরা মিডিয়াকে সেই জায়গাটায় দেখতে চাচ্ছি।’