মানিকগঞ্জে খুচরাবাজারে শুকনা মরিচের চেয়ে দাম বেশি কাঁচা মরিচের
গতকাল রোববার দুপুর ১২টা। কখনো মুষলধারে, কখনো গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। বৈরী এই আবহাওয়ায় ক্রেতা কম থাকায় মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড কাঁচাবাজারসংলগ্ন নিজের মুদিমালের দোকানে বসে বসে গল্পে মেতেছিলেন পিন্টু ও তাঁর বন্ধু মাসুদ রানা। তাঁদের গল্পের প্রসঙ্গ ছিল কাঁচা মরিচের দরদাম।
মাসুদ বলছিলেন, ‘কখনো শুনি নাই, শুকনা মরিচের থেকে কাঁচা মরিচের দাম বেশি। অথচ বাস্তবে এখন তাই-ই। জীবনে কাঁচা মরিচের এত দাম আগে দেখি নাই। কাঁচা মরিচের দামে এবার রেকর্ড হয়েছে। কাঁচা মরিচের আকাশচুম্বি দামের কারণে কেউ কেউ শুকনা মরিচ কিনছেন।’
তাঁদের এই কথার সূত্র ধরে পাশে কাঁচাবাজারে গিয়ে সত্যতাও পাওয়া গেল। গতকাল জেলা সদরের বড় এ বাজারে শুকনা মরিচ প্রতি কেজি ৪৫০ টাকা আর কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছিল ৫৬০ টাকা। তবে বাজারে কাঁচা মরিচের ঘাটতিও দেখা গেল। বাজারের ৩০ জন খুচরা ব্যবসায়ী থাকলেও ১৫ থেকে ১৬ জনের দোকানে কাঁচা মরিচ রয়েছে। এসব দোকানে কাঁচা মরিচের পরিমাণও কম।
খুচরা ব্যবসায়ীরা ভাষ্যমতে, চাহিদার তুলনায় কাঁচা মরিচের সরবরাহ কম। কৃষকদের কাছ থেকেই বেশি দামে কাঁচা মরিচ কিনতে হচ্ছে। আর এতে প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারেও।
আর মরিচচাষিরা বলছেন, এবার অতিরিক্ত খরায় গাছের পাতা কুঁকড়ে যাওয়ায় কাঁচা মরিচের ফলন আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। বেশি দামে কাঁচা মরিচ বিক্রি করলেও ফলন কম হওয়ায় লোকসানে পড়েছেন তাঁরা।
মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড কাঁচাবাজারের খুচরা ব্যবসায়ী জেলা সদরের ভাটবাউর গ্রামের আইয়ুব আলী বলেন, আড়তেই মরিচের সরবরাহ কমেছে। এ কারণে খুচরাবাজারেও কাঁচা মরিচ কম। অতিরিক্ত বাড়তি দামের কারণে তিনি কাঁচা মরিচ কেনাবেচা সাময়িক বন্ধ রেখেছেন। তিনি আরও বলেন, গতকাল শুকনা মরিচ কেজিপ্রতি ৪৫০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। অথচ এক কেজি কাঁচা মরিচের দাম শুকনা মরিচের থেকে ১০০ টাকারও বেশি। কাঁচা মরিচের এই অস্বাভাবিক দামের কারণে কেউ কেউ শুকনা মরিচেও ভরসা রাখছেন।
তবে এক দিনের ব্যবধানে গতকাল রোববার আজ কাঁচা মরিচের দাম কিছুটা কমেছে। গত শনিবার জেলার খুচরাবাজারে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। গতকাল তা কমে ৫৬০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
গতকাল দুপুরে কাঁচা মরিচ কিনতে আসেন জেলা সদরের জয়রা গ্রামের রিকশাচালক আরশেদ আলী। অতিরিক্ত দামের কারণে কাঁচা মরিচ না কিনে ১০০ গ্রাম শুকনা মরিচ কেনেন তিনি। এ সময় কথা হলে তিনি বলেন, ‘বৃষ্টির মধ্যে সারাদিন রিকশা চালাইয়্যা ৭০০ ট্যাহা কামাই (রোজগার) হয় না। অ্যাতো দামে কাঁচা মরিচ কিনুম কেমনে!’
দেশের মরিচ উৎপাদনের জেলাগুলোর মধ্যে মানিকগঞ্জ অন্যতম। জেলার সাতটি উপজেলার মধ্যে শিবালয়, হরিরামপুর ও ঘিওরে ব্যাপকভাবে মরিচের আবাদ করে থাকেন চাষিরা।
গতকাল সন্ধ্যায় ঘিওর উপজেলার বৈন্যা গ্রামের মরিচচাষি বিল্লাল উদ্দিন (৫২) প্রথম আলোকে বলেন, এ বছর এক বিঘায় কাঁচা মরিচের আবাদ করেছেন তিনি। এ পর্যন্ত মাত্র তিন মণের মতো মরিচ বিক্রি করেছেন। অথচ গত বছর একই পরিমাণ জমিতে আবাদ করে প্রায় ৪০ মণ মরিচ পেয়েছিলেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) ড. মোছা. মমতাজ সুলতানা প্রথম আলোকে বলেন, অতিরিক্ত খরা এবং ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণের কারণে গাছের পাতা কুঁকড়ে যেতে পারে। এ কারণে এবার জেলায় মরিচের ফলন কমেছে। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে জমিতে চারা রোপণের আগে ব্যাকটেরিয়ানাশক ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। আর অতিরিক্ত খরার সময় জমিতে সেচের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে খেয়াল রাখতে হবে জমিতে জলাবদ্ধতা যেন না হয়।