গতকাল রোববার দুপুরে শহরের চৌমোহনা এলাকার শ্রীশ্রী নতুন কালীবাড়িতে একটি প্রতিমা নির্মাণ করছিলেন শিবু রুদ্র পাল। কাজের চাপে এখন তাঁর দম ফেলার ফুরসত নেই। কারণ, দেবী দুর্গার আগমনের সময় ঘনিয়ে আসছে। বিভিন্ন সংঘ ও সংস্থার সঙ্গে প্রতিমা নির্মাণের চুক্তি করেছেন শিবু। এখন সময়মতো প্রতিমা তৈরি করে তাদের হাতে তুলে দিতে হবে।

কাজ করতে করতেই শিবু বললেন, ভাদ্র মাসের ২ তারিখ দেবী দুর্গার প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন। ১৪ আশ্বিনের মধ্যে সব কটির কাজ শেষ করতে হবে। এ বছর সিলেটের বালাগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, মৌলভীবাজারের বারইকোনা, মাতারকাপন, হরিজন সম্প্রদায় ও শমসেরগঞ্জের ছয়টি প্রতিমা নির্মাণের কাজ করছেন তিনি। তাঁর এ কাজে সহযোগিতা করেন ভাই শম্ভু রুদ্র পাল।  

মুখ আর হাত যেন সমানতালে চলছে শিবুর। কাজ করতে করতে বললেন, ‘আর কিছু তো করি না। সারা বছর এই একটা কাজই করি। এই প্রতিমা নির্মাণই জীবিকা।’

মৌলভীবাজার শহরের হরিজন সম্প্রদায়ের ফরমাশ দেওয়া একটি প্রতিমার কাজ করছিলেন তখন। বাঁশের কাঠামোর ওপর কাদামাটি দিয়ে ফুটিয়ে তুলছেন দেবীকে। শিবুর হাতের সুনিপুণ কৌশলে একটু একটু করে দেবীর অবয়ব ফুটে উঠছে।

পূজা আয়োজকদের দেওয়া ছবিটা শুরুতেই মাথায় গেঁথে নিয়েছেন বলে জানালেন শিবু। সেই ছবিই এখন মাটির মূর্তিতে আকার নিচ্ছে। এই দুর্গাপ্রতিমার সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের গোবর্ধন লীলার আরও ১০টি মূর্তি আছে। সব কটি মূর্তিই আশপাশে ছড়ানো আছে। ফাঁকে ফাঁকে সব কটিতেই হাত দিচ্ছেন। প্রতিমার আকার অনুযায়ী ৩৫ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা পারিশ্রমিক নিচ্ছেন তিনি। স্থানীয় হওয়ায় সবাই পরিচিত। তাই খুব দরদাম করতে পারেন না।

শিবু রুদ্র পাল বলেন, প্রতিমা নির্মাণের যাবতীয় খরচ কারিগরের। আয়োজকেরা শুধু টাকা দেবেন আর মূর্তি নেবেন। এই খরচের মধ্যে বাঁশ, মাটি, কাপড়, রং, অলংকার—সবকিছুই আছে। একটি দুর্গাপ্রতিমা বানাতে ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়।

বছরে অন্তত ৫০০ প্রতিমা তৈরি করি। বাবার মৃত্যু হয়েছে প্রায় ২০ বছর। সেই হিসাবে এই ২০ বছরে প্রায় ১০ হাজার ছোট-বড় প্রতিমা আমি তৈরি করেছি।
শিবু রুদ্র পাল

প্রতিমা নির্মাণের এই দক্ষতা উত্তরাধিকারসূত্রেই পেয়েছেন শিবু। বাবা-দাদা, এমনকি তাঁদেরও আগের প্রজন্মও প্রতিমা নির্মাণ পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শিবু যখন স্কুলে পড়তেন, তখন থেকেই বাবার সঙ্গে কাজে থাকতেন। এসএসসি দেওয়ার পর পুরোপুরি এই কাজে জড়িয়ে গেলেন। যত দিন বাবা ছিলেন, বাবার সহযোগী হয়ে কাজ করেছেন।

শিবু বলেন, ‘আমার ওস্তাদ আমার বাবাই। তাঁর কাছেই সব শেখা। দুর্গা, সরস্বতী, বাসন্তীপূজার দুর্গা, কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মীসহ ছোট-বড় সব প্রতিমা বানাই। বছরে অন্তত ৫০০ প্রতিমা তৈরি করি। বাবার মৃত্যু হয়েছে প্রায় ২০ বছর। সেই হিসাবে এই ২০ বছরে প্রায় ১০ হাজার ছোট-বড় প্রতিমা আমি তৈরি করেছি।’

সারা বছর কাজ থাকলেও মূলত দুর্গা ও সরস্বতী পূজার সময় বেশি ব্যস্ততা। সময় হাতে থাকলে প্রতিবছরই পাঁচ থেকে সাতটি দুর্গাপ্রতিমা নির্মাণ করেন তিনি। এ ছাড়া সিমেন্ট দিয়ে স্থায়ী প্রতিমাও নির্মাণ করেন শিবু। পাকা প্রতিমা নির্মাণে আকার অনুযায়ী ১৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা পারিশ্রমিক নেন।

শিবু বলেন, ‘প্রতিমা নির্মাণ আমাদের পৈতৃক পেশা। দাদারাও করেছেন। দাদার বাবাও করেছেন। সারা বছরই কাজ আছে। যখনই কাজ, তখনই রুজি। কাজ করছি, খাচ্ছি।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন