পিরোজপুরের রসগোল্লার সঙ্গে দইয়েরও কদর বেড়েছে
সুনাম ও ব্যবসায়িক ভাবনা থেকে গুণগত মান বজায় রেখে বহু বছর ধরে পিরোজপুরে ভালো মানের বিভিন্ন ধরনের মিষ্টান্ন তৈরি হচ্ছে। জেলায় বিয়েসহ যেকোনো অনুষ্ঠানে রসগোল্লাসহ বিভিন্ন মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য হলেও কয়েক বছর ধরে দুলাল মুন্সি নামের এক ব্যক্তির হাত ধরে বেড়েছে দইয়ের কদরও। এখানকার রসগোল্লা ও দইয়ের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে জেলার সীমানার বাইরেও।
পিরোজপুর শহরের মিষ্টান্নের কথা উঠলেই চলে আসে দুলাল দাশের রসগোল্লা, হুজুরের রসগোল্লা ও বেকুটিয়ার দুলাল মুন্সির দইয়ের কথা। এসবের স্বাদ একবার নিলে বারবার খেতে ইচ্ছা করবে। জেলার কয়েকজন মুরব্বির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পিরোজপুর শহরের রসগোল্লার খ্যাতি পাকিস্তান আমল থেকে। তবে বর্তমান সময়ে শহরের দুলাল দাশ ও হুজুরের রসগোল্লার খ্যাতি রয়েছে।
উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর পিরোজপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক খালিদ আবু বলেন, পিরোজপুরে এক সময় আমিত্তির সুনাম ছিল। তখন অতিথিরা বাড়িয়ে আমৃত্তি নিয়ে আসতেন। তিন দশক ধরে এখানকার রসগোল্লা চাহিদা অনেক বেড়েছে। এখন ঈদ, পার্বণ ও অনুষ্ঠানে অতিথিদের আপ্যায়নে খাবারের সঙ্গে মিষ্টান্ন হিসেবে রসগোল্লা ও দই দেওয়া হয়। বিশেষ করে দুলাল দাশের মিষ্টি ও দুলাল মুন্সির দই স্বাদে মানে অনন্য হওয়ায় এর কদর রয়েছে।
প্রায় দেড় দশক আগে বেকুটিয়া ফেরিঘাটের পূর্ব প্রান্তে একটি খাবারের হোটেল খুলে বসেন দুলাল মুন্সি (৫৪)। প্রথমে পরোটা–মিষ্টির পাশাপাশি কয়েক কেজি দুধের দই তৈরি করতেন। দিন দিন এই দইয়ের সুনাম ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বিশেষ করে গত বছরের সেপ্টেম্বরে কঁচা নদীর ওপর বঙ্গমাতা সেতুর উদ্বোধনের পর দুলাল মুন্সির দই বেশি জনপ্রিয়তা পায়। সেতুতে বেড়াতে আসা মানুষ দুলাল মুন্সির সুস্বাদু দইয়ের স্বাদ দিতে ভোলেন না।
স্বাদে ও মানে অনন্য হওয়ায় দুলাল মুন্সির দই ঐতিহ্য হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন কাউখালী উপজেলার শংকরপুর গ্রামের সাবেক শিক্ষক খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমাদের এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে দই তৈরি করা হয়। রাসায়নিক বস্তু ছাড়া দই তৈরি করায় এর স্বাদ চমৎকার। স্বাদে বৈচিত্র্য ও খাঁটি দুধের হওয়ায় এলাকায় দুলালের দধির কদর বেশি। সম্প্রতি এ দইয়ের খ্যাতি আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে সেতু এলাকায় বেড়াতে আসা মানুষ এখানে দই খেতে প্রশংসা করছেন। বাণিজ্যিকভাবে আরও বেশি দই উৎপাদন করা গেলে দুলাল মুন্সির দই ঐতিহ্য হয়ে উঠবে।’
সম্প্রতি দুলাল মুন্সির দইয়ের দোকানে কথা হয় বরিশাল নগরীর রূপাতলী এলাকার জাহিদ হাসানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘কঁচা নদীর বঙ্গমাতা সেতু দেখতে এসে সেতু ঘুরে দেখার পর খোঁজ নিলাম এখানে ঐতিহ্যবাহী খাবার কী পাওয়া যায়। স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে দইয়ের কথা জেনে দই খেয়েছিলাম। এখানকার দই সত্যিই অসাধারণ। তাই বন্ধুদের নিয়ে আবার দই খেতে এলাম।’
দইয়ের সঙ্গে মিষ্টিও বানাতেন দুলাল মুন্সি। দইয়ের চাহিদা বাড়ার কারণে মিষ্টি বানানো এখন বন্ধ করে দিয়েছেন তিনি। দুলাল মুন্সি বলেন, ঈদের দিন থেকে চার পাঁচ দিন আমার দুই মণ দুধের দইয়ের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী দুধ না পাওয়ায় অনেক ক্রেতাকে ফিরিয়ে দিতে হবে। এ ছাড়া দুধের দাম বাড়ার কারণে দইয়ের দাম বাড়াতে হয়েছে। এক বছর আগে এক কেজি দই ১৫০ টাকায় বিক্রি করা হতো। এখন ২০০ টাকা দরে দইয়ের কেজি বিক্রি হয়।
পিরোজপুর শহরের দামোদর সেতু এলাকায় দুলাল মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। সেখানে দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিক্রি করা হয় মিষ্টান্নজাতীয় বিভিন্ন পণ্য। এর মধ্যে বেশি বিক্রি করা হয় রসোগোল্লা। প্রয়াত দুলাল দাশের হাত ধরে এই মিষ্টির সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর দুই ছেল নিত্য দাশ ও গোরাঙ্গা দাশ এখন ব্যবসা পরিচালনা করছেন।
নিত্য দাশ বলেন, ‘আমার বাবা একসময় মাঠা বিক্রি করতেন। দুই দশক ধরে আমরা বাণিজ্যিকভাবে নানা পদের মিষ্টান্নর সঙ্গে রসগোল্লা তৈরি করি। ঈদের সময়ে রসগোল্লার চাহিদা অন্য সময়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেড়ে যায়। প্রতিটি মিষ্টি আকার ভেদে এখন ১২ ও ২০ টাকায় বিক্রি হয়।’
পিরোজপুর শহরের অবসরপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা জগৎ প্রিয় দাস বলেন, ‘অতিথি অপ্যায়ন বা অনুষ্ঠানে মিষ্টান্ন অন্যতম অনুষঙ্গ। আমাদের অঞ্চলে রসগোল্লার কদর বেশি। শহর থেকে পিরোজপুরে বেড়াতে আসা মানুষ এখানের রসগোল্লা খেতে ভোলেন না।’