দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা, পাম জুমেইরাহ ও মারসাতে ফ্ল্যাট আছে একরামুজ্জামানের

এস এ কে একরামুজ্জামান
ফাইল ছবি

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা, পাম জুমেইরাহ ও মারসাতে তিনটি ফ্ল্যাট আছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ এ কে একরামুজ্জামানের। এ ছাড়া গত সাত বছরে তাঁর নগদ অর্থ বেড়েছে ২৭ গুণের বেশি। আর ব্যাংকঋণ প্রায় ২২ গুণ। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ। তবে বার্ষিক আয় কমেছে পৌনে চার গুণ।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একরামুজ্জামানের জমা দেওয়া হলফনামার সঙ্গে একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামা বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

আরএকে সিরামিকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) একরামুজ্জামান ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনে এর আগেও একাধিকবার প্রার্থী হয়েছিলেন। এর মধ্যে নবম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে লড়ে পরাজিত হন। ২০২৪ সালে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ে জয় পান।

একরামুজ্জামান বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ছিলেন। পরে তাঁকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়। ২০২৪ সালে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। একই বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে একরামুজ্জামানকে উপদেষ্টা করা হয়। তবে তাঁর দাবি, কমিটি ঘোষণার পরই তিনি পদত্যাগপত্র আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে জমা দিয়েছেন।

হলফনামার তথ্যানুযায়ী, একরামুজ্জামান এইচএসসি পাস। বয়স ৬৯ বছর, পেশা ব্যবসা। ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে তিনি ঋণ নিয়েছেন প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন আদালতে একরামুজ্জামানের বিরুদ্ধে সাতটি মামলা হয়েছে।

তিনটি নির্বাচনে একরামুজ্জামানের দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত সাত বছরের ব্যবধানে একরামুজ্জামানের বার্ষিক আয় কমেছে পৌনে চার গুণ। বর্তমানে তাঁর বার্ষিক আয় ৪ কোটি ৪৬ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। এর মধ্যে ১ কোটি ১৬ লাখ ২৮ হাজার টাকা আয় আসে বাড়ি ভাড়া থেকে। ব্যবসা থেকে আয় দেখিয়েছেন ৬৩ লাখ ৮০ হাজার ৯৭৪ টাকা। তাঁর গৃহিণী স্ত্রী নাঈমা আক্তার জাহানের আয় ৬ লাখ ২৩ হাজার টাকা।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বছরে একরামুজ্জামানের আয় ছিল প্রায় ৫৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকা এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় তাঁর আয় ছিল ১৬ কোটি ৭৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকা।

আয়কর বিবরণী

২০২৫-২৬ অর্থবছরে একরামুজ্জামান ৪ কোটি ৮৫ লাখ ৩২ হাজার টাকা আয়কর দিয়েছেন। আয়কর রিটার্নে সম্পদ দেখিয়েছেন ২৬৫ কোটি ৩ লাখ ২ হাজার টাকার। তাঁর স্ত্রী নাঈমা জাহান আক্তার আয়কর দিয়েছেন ১৭ হাজার টাকা। আয়কর রিটার্নে সম্পদ দেখিয়েছেন ২ কোটি ১৭ লাখ ৬ হাজার টাকার। ছেলে সাইলিন জাহান আকবর আয়কর দিয়েছেন ১০ লাখ ৯৩ হাজার এবং সম্পদ দেখিয়েছেন ১১ কোটি ৩১ লাখ ৩৭ হাজার টাকার। আরেক ছেলে কামার উজ জামান আয়কর দিয়েছেন ৪০ লাখ ৪৯ হাজার টাকা, সম্পদ দেখিয়েছেন ১ কোটি ২৪ লাখ ৪১ হাজার টাকার।

অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদ

গত সাত বছরের ব্যবধানে একরামুজ্জামানের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ, নগদ অর্থ এবং ব্যাংকঋণ বেড়েছে। সাত বছরে তাঁর অস্থাবর সম্পদ ৫৬ কোটি ২৩ লাখ ৪৪ হাজার ৩৮৭ টাকা বেড়ে হয়েছে ৪২১ কোটি ৯২ লাখ ১২ হাজার টাকা। এর মধ্যে পাঁচটি ব্যাংকে জমা আছে ৩৭ লাখ ৭ হাজার টাকা। শেয়ারে বিনিয়োগ ৩১৪ কোটি ২১ লাখ ৪২ হাজার টাকা ও অন্যান্য থেকে আয় ৭৪ কোটি ৭৯ লাখ ১৩ হাজার টাকা। এর বাইরে নিজের নামে ৩০ হাজার টাকার স্বর্ণ বা অন্যান্য মূল্যবান ধাতু, ১৮ লাখ টাকার বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্য ও ৪ লাখ ৩৯ হাজার টাকার আসবাব আছে।

দুবাইয়ে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন বুর্জ খলিফা
ফাইল ছবি: রয়টার্স

স্থাবর সম্পদের মধ্যে দুবাইয়ের পাম জুমেইরাহতে ৬ কোটি ৮৫ লাখ ৪২ হাজার টাকার ২ হাজার ১৫৭ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট, মারসায় ১ কোটি ৩২ লাখ ৩০ হাজার টাকার ১ হাজার ৪২০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট ও বুর্জ খলিফায় ২ কোটি ৪৪ লাখ ৭৭ হাজার টাকার ৯৮৭ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাটের তথ্য উল্লেখ করেছেন একরামুজ্জামান। সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা ফ্ল্যাট তিনটির তথ্য আগের দুই নির্বাচনের হলফনামায় উল্লেখ করেননি তিনি।

একরামুজ্জামানের নগদ অর্থ সাত বছরে ২৭ দশমিক ১৫ গুণ বেড়ে হয়েছে ২১ কোটি ৬৯ লাখ ২৮ হাজার টাকা। ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় এই পরিমাণ ছিল ৭৯ লাখ টাকা। গত নির্বাচনের সময় ছিল ২৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।

বর্তমানে একরামুজ্জামানের স্ত্রীর নামে অস্থাবর সম্পদ আছে মোট ২ কোটি ৭৯ লাখ ৯৮ হাজার টাকা। এর মধ্যে স্ত্রীর কাছে নগদ অর্থ আছে ২৫ লাখ ৪২ হাজার টাকা, ব্যাংকে ৩৯ লাখ ৫৪ হাজার টাকা, শেয়ারে বিনিয়োগ ২ কোটি ২ লাখ ১ হাজার, ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ও ৩ লাখ টাকার আসবাব আছে।

গত নির্বাচনের সময় একরামুজ্জামানের অস্থাবর সম্পদ ছিল প্রায় ৪১৮ কোটি ৩২ লাখ টাকার এবং স্ত্রীর নামে প্রায় ৮১ লাখ ৬০ হাজার টাকার। ২০১৮ সালে তাঁর অস্থাবর সম্পদ ছিল ৩৬৫ কোটি ৬৮ লাখ ৬৮ হাজার ২৫২ টাকার ও ১০ লাখ ৬২ হাজার ইউএস ডলার এবং স্ত্রীর নামে ছিল ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকার।

একরামুজ্জামানের স্থাবর সম্পদ আছে মোট ৮২ কোটি ৯৯ লাখ ৫ হাজার টাকার। এর মধ্যে নাসিরনগর, মুক্তাগাছা, হবিগঞ্জ, ময়মনসিংহে ৫ কোটি ৪ লাখ ৫৫ হাজার ৮৬৭ টাকার ২ হাজার ৪৩ শতাংশ কৃষিজমি; নাসিরনগর, পূর্বাচল ও রূপগঞ্জে ১১ কোটি ৭ লাখ ৮৭ হাজার টাকার ৭৫৮ শতাংশ অকৃষিজমি; ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে ৩৬২ শতাংশ জায়গায় ৪৬ কোটি ২১ লাখ ৮৮ হাজার টাকা মূল্যের ভবন, উত্তরায় ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ জায়গায় ১০ কোটি ২ লাখ ২৩ হাজার টাকা মূল্যের বাড়ি আছে। স্ত্রীর স্থাবর সম্পদ আছে মোট ২ কোটি ৩৩ লাখ ৭ হাজার টাকার।

গত নির্বাচনের সময় একরামুজ্জামানের স্থাবর সম্পদ ছিল ১০৭ কোটি ৩৬ লাখ ৪২ হাজার টাকার। ২০১৮ সালের নির্বাচনে স্থাবর সম্পদ ছিল প্রায় ৭২ কোটি ৩০ লাখ টাকার ৬৮ হাজার টাকার।

বর্তমানে একরামুজ্জামান নিজ নামে ২২৯ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬০২ টাকা, স্ত্রীর নামে ২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা এবং দুই সন্তানের নামে ২ কোটি ৫৩ লাখ ৬ হাজার ৪৬২ টাকার দায় থাকার তথ্য হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। এই সংখ্যা গত নির্বাচনে নিজ নামে ছিল প্রায় ২৩৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা এবং ২০১৮ সালে ছিল প্রায় ২১৪ কোটি ৫ লাখ টাকা।

সাত বছরের ব্যবধানে একরামুজ্জামানের ঋণ বেড়েছে প্রায় ২২ গুণ। বর্তমানে নির্ভরশীল ব্যক্তিসহ ১২টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ৩৫টি ব্যাংক, সাতটি প্রতিষ্ঠান ও দুজন ব্যক্তির কাছ থেকে ২ হাজার ৯২১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। গত নির্বাচনের আগে ২০টি ব্যাংকসহ মোট ২২টি প্রতিষ্ঠান থেকে ২ হাজার ৩০১ কোটি টাকার এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে ১৩৩ কোটি ৭০ লাখ ৬ হাজার ১০৮ টাকা ঋণ নেওয়ার তথ্য দিয়েছিলেন।

একরামুজ্জামান নির্বাচনে নিজের ব্যবসা থেকে ২৫ লাখ টাকা ব্যয় করবেন বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন।