মেঘনার চরে জোয়ার–ভাটার জীবনে বেঁচে থাকার সংগ্রাম

ভোলার দৌলতখান উপজেলার চর বৈরাগীতে গড়ে উঠেছে মহিষ বাথান। এটি নিজাম হাওলাদারের বাথান নামে পরিচিত। এখানে মহিষের সংখ্যা তিন শতাধিকছবি: প্রথম আলো

মেঘনার বুক চিরে জেগে উঠেছে অসংখ্য চর। কোথাও হাঁটু–সমান কাদা, কোথাও আবার ঘন ঝোপঝাড়ে হারিয়ে যায় সরু আলপথ। কোথাও আছে সবুজ ঘাস। এসব চরে মহিষের পাল চরে বেড়ায়। সেখানে গড়ে উঠেছে বাথান। 

‘বাথান’ শব্দের অর্থ গবাদিপশুর থাকার স্থান। একধরনের গোচারণভূমি ও গোশালা। মহিষ–গরু থাকে, আর যাঁরা এদের দেখভাল করেন, তাঁদের বলা হয় বাথানি বা রাখাল। ভোলায় তাঁরা ‘রাখফাল’ নামেও পরিচিত। 

তবে ওই সব চরে যাতায়াত সহজসাধ্য নয়। সপ্তাহে নির্দিষ্ট কয়েক দিন ছাড়া কোনো লঞ্চ বা ট্রলার চলে না। বাকি সময়ে ভরসা জেলেনৌকা কিংবা কারও ব্যক্তিগত ইঞ্জিনচালিত ডিঙি। তাই দিনক্ষণ ঠিক করে রওনা হই ভোলার দৌলতখান উপজেলার চর বৈরাগীর এক মহিষ বাথানের উদ্দেশ্যে। 

দুর্গম পথের যাত্রা

ভোলা সদর উপজেলার ইলিশা ইউনিয়নের তালতলী লঞ্চঘাট থেকে ট্রলারে উঠি। সেখান থেকে নামি মধুপুর চরে। আবার বাহন ইঞ্জিনচালিত নৌকা। মাঝপথে ডুবোচরের অজুহাতে এক দাঁড়টানা নৌকায় তুলে দেওয়া হলো। নৌকা থেকে নেমে ধানখেতের আলপথ দিয়ে বৈরাগীর চরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে চারদিকে ভেসে আসছিল বকের ডাক, পানকৌড়ির ওড়াউড়ি, মাছ ধরার জেলে আর ঘাস খেতে থাকা গরু–মহিষের গুঙানি। চর বৈরাগীর ছোট্ট বাজার পার হয়ে অবশেষে বাথানে যাওয়ার দুই ‘গাইড’–এর দেখা পেলাম। মহিষ-মালিক নিজাম ফরাজির নির্দেশেই দুই শিশু পথ দেখিয়ে নিতে  এসেছে।

আমার ডান পাশে হাঁটছে আবুল হাসেম। বয়স মাত্র ৯ বা ১০। মাসিক বেতন ৯ হাজার টাকা। খাওয়া বাবদ প্রতিদিন পায় দেড় শ টাকা। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সে দ্বিতীয়। মাস শেষে সব টাকা বাবার হাতে তুলে দিতে হয়। তার সঙ্গে আছে সাকিব। বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলায়। তার বয়স ১৪। মাসে বেতন ১৫ হাজার টাকা। ‘বাবা-চাচারা বহুদিন ধরে বাথানির কাজ করেন’ তাই সাকিবও এই কাজ শুরু করেছে। 

কাদা, খাল আর দুর্গম পথ পেরিয়ে যেতে হবে। পাজামা হাঁটু অব্দি গুটিয়ে, এক হাতে জুতা-মুঠোফোন, পিঠে ব্যাগ, গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে যাত্রা শুরু হয়। পথ ভীষণ দুর্গম। কোথাও নরম কাদা, কোথাও গভীর গর্ত, কোথাও আবার ছোট খাল পেরােতে হয় কাদাপানি ভেঙে। প্রায় দেড় ঘণ্টা হাঁটার পর দুই জায়গায় নলকূপের দেখা পেলাম। তবে সুপেয় হবে কিনা তাই পানি পান করলাম না। ভেবেছিলাম বাথানে গিয়ে পানি পান করব। কিন্তু সেখানে গিয়ে বুঝলাম, এখানে হাত-মুখ ধোয়া থেকে শুরু করে পান করার পানিও নদী থেকে তুলেই ব্যবহার করতে হয়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও গলা ভেজাতে হলো সেই নদীর পানিতে।

বাথানের এক রাত

বৈরাগীর চরের মহিষের বাথানটি নিজাম হাওলাদারের বাথান নামে পরিচিত। যদিও এখানে একাধিক মালিকের মহিষ আছে। মহিষের সংখ্যা তিন শতাধিক। এখানে মেয়ে মহিষকে বলে মাদাম, পুরুষকে বলে চেলা। পুরুষ ও ছাও (বাচ্চা) নেই এমন মা মহিষ থাকে আলাদা বাথানে, আরও ভেতরের দিকে। প্রজনন ও দুধ দোহনের সুবিধার্থে এমন নিয়ম করা হয়েছে। 

চারপাশে সুপারির চেরা পুঁতে, মাটি ফেলে উঁচু মাটির কিল্লা বানানো হয়েছে। তার ওপর মাচা ঘর, টিনের চালা, কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে হয়। খাবার হিসেবে পেলাম মাটির সানকিতে চাষের পাঙাশ মাছ আর ভাত। প্রচণ্ড ক্ষুধায় মনে হলো যেন অমৃত। তবে পানি খেতে গিয়ে যে দম বন্ধ হয়ে এল। নদীর সেই কাঁচা পানিই এখানে ভরসা। 

সূর্যাস্তে চর যেন এক অন্য জগৎ। লাল সূর্য ডুবছে, দূর থেকে ট্রলার–ট্রাক্টরের শব্দ, আর মাইলের পর মাইলজুড়ে মহিষ ও গরুর দল হাঁটছে সবুজ ঘাসে নাক ডুবিয়ে। পাখিরা নেমে আসে বাথানে পোকা খেতে—খঞ্জনা, ফিঙে, শালিক, গুবরে শালিক—তাদের ডাক মিশে যায় চরাঞ্চলের নিস্তব্ধতার সঙ্গে।

মাচাঘরে নেই তেমন আসবাব—কয়েকটি আধময়লা কাঁথা, হোগলার বিছানা, কিছু রশি, ওষুধপত্র, চাল–ডাল–তেল, আর তালাবদ্ধ তোরঙে রয়েছে মহিষের জন্য ইনজেকশন আর ওষুধ।

মা মহিষগুলো সন্ধ্যার পর বাচ্ছা নিয়ে বাথানে ফিরতে থাকে। তাদের নাম বেশ চমকপ্রদ— কলি কুমার, রূপকুমার, জরিনা, রূপবান, শিরমালা, রাজমালা, কাঞ্চনমালা, ব্যারিস্টার, কবুতর, নয়নতারা, পাইলট, কাপ্তান, শাবানা, রাজ্জাক, পিস্তল, বন্দুক প্রভৃতি। যদি কোনো মহিষ ভুল পথে যায়, বাথানিরা নাম ধরে ডাক দেন, ‘হির নয়নতারা, হির’, ‘হির কাঞ্চন, লাইনে আয়।’ বাথানিরা মা মাহিষের পায়ে জোড় (দুই পা বাঁধার রশি) লাগিয়ে ছাওগুলোকে কেল্লার মধ্যে তোলে। 

বড় বাথানি বিল্লাল হোসেনের বয়স ৪০ বছর। ৬ বছর বয়স থেকেই তিনি এই পেশায়। পশ্চিম ইলিশায় তাঁর বাড়ি। মাসের শুরুতে একবার বাড়ি যান। তাও অনেক সময় সম্ভব হয় না। 

জোয়ার–ভাটার জীবন 

রাত গভীর হলে মহিষ মাঠে ঘাস খেতে বের হয়। বাথানিরা পালা করে টর্চ হাতে মাঠে গিয়ে দেখে আসে কে কোথায় আছে। কোনো মহিষ ধানখেতের মধ্যে চলে গেলে মালিককে দিতে হয় জরিমানা, যা হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। 

এভাবে রাত কাটে টহল দিয়ে, বর্ষাকালে জোয়ার-ভাটায় ভিজে। আর শীতকালে ঠান্ডার মধ্যে।    

জোয়ার–ভাটার মতোই জীবন বাথানি আর মহিষের। বর্ষায় যখন নদীর জোয়ারে কিল্লা উপচে পানি ওঠে, তখন মহিষকে রাখা যায় না। পানির তোড়ে তারা প্রায়ই ভেসে যায়। তখন বাথানিদের নেমে যেতে হয় নদীতে, সাঁতরে সাঁতরে খুঁজে আনতে হয় মহিষ। চর থেকে চরে ঘুরে বেড়াতে হয়। ভাটায় ঘাষ খেতে নামতে না পারলে মহিষদের অপুষ্টি দেখা দেয়, দুধ উৎপাদন কমে যায়। ঝড়, বৃষ্টি, সাপ, বেজির ভয় উপেক্ষা করে রাখালদের সারাক্ষণ মহিষের পাশে থাকতে হয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাথান এলাকায় চুরি–ডাকাতি বেড়ে গেছে। 

বাথানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চরের অস্থায়ী ‘কিল্লা’ ঘরগুলো দুর্যোগে প্রায়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বর্ষায় চর প্লাবিত হলে ঘাস, খড়, ছাউনি সব নষ্ট হয়ে যায়, দেখা দেয় খাদ্যঘাটতি। নিরাপদ আশ্রয় না থাকায় রাখালদের জীবনও হয়ে ওঠে মানবেতর। সরকারি চর হলেও বেসরকারি জোতদাররা লিজ নিয়ন্ত্রণ করে ‘লগ্নি’ নামে বিপুল অর্থ আদায় করেন। একজন রাখাল ৫০টি মহিষ দেখভাল করলেও মাসিক বেতন পান ৫–২০ হাজার টাকা, তাও অনেকে নিয়মিত পান না। ঘাস সংকট, ওষুধ ও চিকিৎসা ব্যয় বাড়ায় মহিষ পালন ব্যয়ও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। 

ভোর থেকেই শুরু হয় দুধ দোহন

ফজরের আজানের পর তখনো অন্ধকার। বাথানিরা কিল্লার দরজা খুলে মা মহিষের নাম ধরে ডাকেন। বাচ্চাগুলো মায়ের গন্ধে দৌড়ে আসে। কয়েক টান চুষে ওলান ফেনালে বাথানিরা দুধ দোহন শুরু করেন। ইনজেকশন দিতে হয় মা মহিষদের; যাদের বাচ্চা মারা গেছে বা বিক্রি হয়েছে, তাদের দুধ ধরে রাখার জন্য। ভোর সাড়ে ছয়টা থেকে নয়টা পর্যন্ত চলে দুধ দোহন, একটানা দাঁড়িয়ে, হাত ব্যথা করে, তবু কাজ থামে না। দুধ দোহন শেষে সবাই মিলে চুলায় চা বানান মহিষের দুধে। ঘন দুধে সর পড়ে। চায়ের সঙ্গে মুড়ি, কখনও মহিষের টক দুধ মাখানো খাওয়া। 

সকাল ৯টার দিকে ভোলা ও লক্ষ্মীপুর থেকে লোকজন আসেন দুধ সংগ্রহ করতে যাঁরা ‘ঘোষ’ নামে পরিচিত। গরু বা মহিষের দুধ দোহন, সংগ্রহ, বিক্রি করা যাঁদের কাজ। নিজাম হাওলাদারের বাথান থেকে দুধ সংগ্রহ করেন অলি ঘোষ। 

বাথানি সাকিবের পরামর্শে ‘ঘোষের’ ট্রলারে উঠে পড়ি। এতে সময় বেশি লাগলেও আর হাঁটতে হবে না। মেঘনার বুক চিরে ফেরার যাত্রা শুরু হয়। দুধভরা ট্রলারে পায়ের জুতা খুলে কাদা মাখা অবস্থায় বসে আছি। দুই ইঞ্জিনের গর্জনে ট্রলার ছুটছে—এক চর থেকে আরেক চরে। 

বাথান থেকে ফিরে এসে কথা হয় ভোলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, জোতদারি প্রথা বন্ধ করে মহিষ মালিকদের লগ্নিমুক্ত সরকারি জমি বরাদ্দ দিলে বাথানজীবনে স্থিতিশীলতা আসবে। একই সঙ্গে আন্তপ্রজননের ফলে মহিষের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়ায় উন্নত জাতের চেলা মহিষ প্রদান জরুরি। পাশাপাশি স্বল্পমূল্যে পশুচিকিৎসা–টিকাদান, ঝড়–সহনশীল আবাসন, বিশুদ্ধ পানি ও সোলার আলো নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনও প্রয়োজন।