শতবর্ষী বুড়িরহাট : বর্ষা এলেই জমে ওঠে নৌকার বেচাকেনা

১০০ বছরের বেশি সময় বুড়িরহাটে নৌকা বেচাকেনা হচ্ছে। গত মঙ্গলবার শরীয়তপুর সদর উপজেলার বুড়িরহাট এলাকায়ছবি : প্রথম আলো

স্থানীয় কৃষিপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাবেচার সুবিধার্থে হাটের যাত্রা শুরু। পরে বর্ষা মৌসুমে কাঠমিস্ত্রিরা নৌকা তৈরি করে এনে ওই হাটে বিক্রি শুরু করেন। একসময় এলাকায় সেটি নৌকার হাট নামে পরিচিতি পায়। ওই হাটের অবস্থান শরীয়তপুর সদর উপজেলার বুড়িরহাট এলাকায়।

১০০ বছরের বেশি সময় বুড়িরহাটে নৌকা বেচাকেনা হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে প্রতি সপ্তাহের মঙ্গলবার ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত এই হাট বসে। প্রতি হাটে ৪০–৫০টি নৌকা বিক্রি হয়।

শরীয়তপুর সদর উপজেলার শেষ প্রান্তে ভেদরগঞ্জ ও ডামুড্যা উপজেলার সীমানাসংলগ্ন এলাকায় বুড়িরহাটে অবস্থিত। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিশ শতকের শুরুতে কৃষিপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাবেচার জন্য সেখানে বাজার স্থাপন করা হয়। পরে প্রতি মঙ্গলবার সাপ্তাহিক হাট বসার প্রচলন হয়। কিছুদিন পর কাঠের তৈরি নৌকা বিক্রি শুরু করেন স্থানীয় মিস্ত্রিরা। পাশাপাশি অনেকে পুরোনো নৌকাও বিক্রির জন্য হাটে নিয়ে আসতেন। সেই ধারাবাহিকতা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

শরীয়তপুর–চাঁদপুর–চট্টগ্রাম আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে বুড়িরহাট বাজার অবস্থিত। বর্তমানে বাজারটিতে দুই শতাধিক স্থায়ী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ ছাড়া একটি উচ্চবিদ্যালয়, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি পুলিশ ফাঁড়ি, একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, একটি কলেজ, মসজিদ ও মন্দির রয়েছে।

স্থানীয় বুড়িরহাট উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সম্ভুনাথ পোদ্দার জানান, ১৯৪৬ সালে বুড়িরহাট উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পর থেকেই বিদ্যালয়ের মাঠে নৌকার হাট বসছে। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অন্তত ৪০ বছর আগেই এখানে নৌকার হাটের প্রচলন হয়েছিল। নৌকার ক্রেতা বা বিক্রেতাদের কাছ থেকে বিদ্যালয় কোনো ধরনের খাজনা আদায় করে না।

প্রতি মঙ্গলবার ভোর পাঁচটা থেকে বুড়িরহাট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে নৌকার হাট বসে। বেলা দুইটা পর্যন্ত চলে কেনাবেচা। প্রতিবছর মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই হাটে নৌকা বিক্রি হয়। প্রতি হাটে ৪০ থেকে ৫০টি বিভিন্ন আকৃতির কাঠের নৌকা বিক্রি হয়।

প্রতি মঙ্গলবার ভোর পাঁচটা থেকে বুড়িরহাট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে নৌকার হাট বসে। বেলা দুইটা পর্যন্ত চলে কেনাবেচা। প্রতিবছর মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই হাটে নৌকা বিক্রি হয়। প্রতি হাটে ৪০ থেকে ৫০টি বিভিন্ন আকৃতির কাঠের নৌকা বিক্রি হয়। নতুন নৌকার দাম ৮ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা এবং পুরোনো নৌকার দাম ৩ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা।

সদর উপজেলার পাটানিগাঁও, চন্দনকর, রুদ্রকর, ভেদরগঞ্জ উপজেলার ছয়গাঁও, সাজানপুর, পাপরাইল, ডামুড্যা উপজেলার ইসলামপুর ও ধানকাঠি এলাকার মিস্ত্রিরা নৌকা তৈরি করেন। কয়েকজন মিস্ত্রির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একজন মিস্ত্রি সপ্তাহে ছোট আকারের দুটি নৌকা তৈরি করতে পারেন। একটি নৌকা বিক্রি করে দুই–তিন হাজার টাকা হয়। বর্ষা মৌসুমে কাঠমিস্ত্রিদের কাজ কমে যায়। তখন তাঁরা বাড়িতে নৌকা তৈরি করে থাকেন। আগে এলাকার বেশির ভাগ কাঠমিস্ত্রি নৌকা তৈরি করতেন। এখন লাভ কম হওয়ায় অনেকে নৌকা তৈরির কাজ ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন।

সদর উপজেলার পাটানিগাঁও গ্রামের বাসিন্দা অনিল মণ্ডলের বয়স ৭০ বছর। ১৫ বছর বয়সে তিনি তাঁর বাবার হাত ধরে কাঠমিস্ত্রির পেশায় আসেন; বাবার কাছেই নৌকা তৈরি শেখেন। মঙ্গলবার বিক্রির জন্য তিনি দুটি নৌকা নিয়ে এসেছেন বুড়িরহাটে।

অনিল মণ্ডল প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা বাপ-দাদারা এই হাটে নৌকা বিক্রি করতেন। সেই আয়েই সংসার চলত। তাঁদের পথ ধরে তিনি চলছেন। ৫৫ বছর ধরে এই হাটে নৌকা বিক্রি করছেন। প্রতিবছর এপ্রিল থেকে নৌকা তৈরি শুরু করেন। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কাজ চলে। এলাকার গোয়ারা ও উড়িয়া জাতের আমগাছের কাঠ দিয়ে নৌকা বানান। বছরের অন্য সময় কাঠমিস্ত্রির কাজ করে সংসার চালান।

প্রতি হাটে ৪০ থেকে ৫০টি বিভিন্ন আকৃতির কাঠের নৌকা বিক্রি হয়। নতুন নৌকার দাম ৮ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা
ছবি : প্রথম আলো

ডামুড্যা উপজেলার ইসলামপুর এলাকার কৃষক আয়ুব আলী (৮০) পুরোনো নৌকা বিক্রি করে নতুন নৌকা কিনতে এসেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এলাকার চারদিকে নদী। বর্ষা মৌসুমে কৃষিজমিতেও পানি থাকে। তখন নৌকা ছাড়া চলাচল করা যায় না। চাষাবাদের কাজেও নৌকার দরকার হয়। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে বুড়িরহাটে নৌকা কিনতে আসতেন। নতুন নৌকা পাঁচ থেকে ছয় বছর ব্যবহার করা যায়। পুরোনো নৌকা মেরামত করেও অনেক দিন চালানো যায়।