সরেজমিন দেখা গেছে, ফুলসর গ্রামে রাস্তার পাশে সিমেন্ট ও রডের স্তূপ। পাশের একটি খোলা জায়গায় একদল শ্রমিক পাকাঘর নির্মাণ করছেন। রাস্তার ঠিক উল্টো দিকে একটি জমির ২৬টি ফলবান আমগাছ কেটে ফেলে রাখা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন ফুলসর গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা শাজাহান আলী মিয়া, ভিটেমাটি হারানো শরবানু বেওয়া, লিয়াকত হোসেন, নজরুল ইসলাম, আনোয়ার হোসেন, অছির উদ্দিন ও ময়েন উদ্দিন।

সরেজমিন দেখা গেছে, ফুলসর গ্রামে রাস্তার পাশে সিমেন্ট ও রডের স্তূপ। পাশের একটি খোলা জায়গায় একদল শ্রমিক পাকাঘর নির্মাণ করছেন। রাস্তার ঠিক উল্টো দিকে একটি জমির ২৬টি ফলবান আমগাছ কেটে ফেলে রাখা হয়েছে। রাস্তা থেকে নেমে কিছুটা দূরে প্রায় দুই একরের চাষ করা জমিতে ইট স্তূপ করে রাখা হয়েছে। পাশে খোলা জায়গায় সংবাদ সম্মেলন করেন গ্রামবাসী।

আমার স্বামী তো টাকা দিয়ে জমি কিনে বাড়ি করেছে। সরকার তো ৪৯ বছরে একবারও জমির মালিকানা দাবি করেনি। এখন জমি নিয়ে নিলে আমি নাতিপুতি নিয়ে কোথায় যাব?
গ্রামের বাসিন্দা শরবানু বেওয়া (৮২)

বীর মুক্তিযোদ্ধা শাজাহান আলী মিয়া বলেন, ফুলসর মৌজার ৬ নম্বর খতিয়ানের প্রায় ৪০ বিঘা জমির হাল খতিয়ানের (আরএস রেকর্ড) মালিক ছিলেন অর্পণা দেবী। তিনি স্বত্ববান থাকতে ওই জমি আবদুল লতিফ, আবদুল হাই ও আবদুর রউফের কাছে বিক্রি করেন। তাঁদের কাছ থেকে ওই জমি কিনে গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস ও চাষাবাদ শুরু করে ৩০টি পরিবার। ৪৯ বছর ধরে তাঁরা ওই জমি ভোগদখল করছেন। অনেকে বসবাসের পাকা বাড়ি ও ফলের বাগান করেছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সম্প্রতি ভূমি কার্যালয়ের লোকজন এসে তাঁদের জানান, ওই জমি ১৯৭৮ সালে অর্পণা দেবীর স্বামী কালিচন্দ্র চক্রবর্তী সরকারের কাছে হস্তান্তর করেন। তখন ওই জমি খাস খতিয়ানভুক্ত করে সরকার। তাই এখন গ্রামবাসীর ওই জমি ছেড়ে দিতে হবে। গত বৃহস্পতিবার হঠাৎ প্রশাসনের লোকজন ওই জমিতে থাকা আমবাগান ও ফসল কেটে ফেলেন। সেখানে মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে গৃহহীনদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে।

গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা শরবানু বেওয়া (৮২) বয়সের ভারে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না। সংবাদ সম্মেলনে তিনি হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে বসে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী তো টাকা দিয়ে জমি কিনে বাড়ি করেছে। সরকার তো ৪৯ বছরে একবারও জমির মালিকানা দাবি করেনি। এখন জমি নিয়ে নিলে আমি নাতিপুতি নিয়ে কোথায় যাব? ফসল ফলাতে না পারলে খাবই বা কী?’

গ্রামের একটি পাকা বাড়ির মালিক অছির উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘সরকার তো কখনোই বলেনি এসব জমি সরকার খাস করে নিয়েছে। জানলে তো জীবনের সব উপার্জন দিয়ে এই বাড়ি করতাম না।’

নজরুল ইসলাম নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘গ্রামে ৪০টির মতো পরিবার বসবাস করে। এর মধ্যে ৩০টি পরিবার উচ্ছেদ করলে গ্রামটিই বিলীন হয়ে যাবে। কেনা জমি হারিয়ে আমরা ভূমিহীন-গৃহহীন হব, আর অন্যরা ঘরবাড়ির মালিক হবে। এটা তো অমানবিক। আমরা আদালতে মামলা করেছি। কিন্তু প্রশাসন মামলা শেষ হওয়ার আগেই ঘর নির্মাণ শুরু করে দিয়েছে।’

সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জুবায়ের হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, তৎকালীন রাষ্ট্রপতির ১৯৭২/৯৮ নম্বর আদেশমূলে ১০০ বিঘার অতিরিক্ত জমি রাষ্ট্রের অনুকূলে হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশ অনুযায়ী ফুলসর গ্রামের অর্পণা দেবীর স্বামী কালিচন্দ্র চক্রবর্তী তাঁর পরিবারের ১০০ বিঘার অতিরিক্ত ৩৬ একর জমি রাষ্ট্রের অনুকূলে ফিরিয়ে দেন।

জুবায়ের হোসেন আরও বলেন, ‘১৯৭৮ সালের ২২ জুলাই ওই জমি সরকারের নামে খাস খতিয়ানভুক্ত করে সরকার। এখন রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সরকার এসব জমিতে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীরা আদালতে মামলা করেছেন। আমরা আদালতের সিদ্ধান্তের বাইরে কিছুই করব না।’

নাটোর জেলা প্রশাসক শামীম আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর নির্মাণকাজ অব্যাহত থাকবে। কারও অন্যায় আবদার মানা হবে না। তবে মানবিক কারণে যে ৩০টি পরিবারের বাড়ি খাসজমিতে আছে, তাঁদের উচ্ছেদ না করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায় কি না, তা বিবেচনা করা হবে।