খুলনার কয়রা উপজেলায় রহিমা ও মনোয়ারার মতো নদীতীরবর্তী গ্রামগুলোর নারী-পুরুষের জীবিকার প্রধান উৎস জাল টেনে বাগদার পোনা আহরণ। দিন ও রাতের জোয়ারে দুবার পোনা ধরেন তাঁরা। এক সপ্তাহ ধরে শৈত্যপ্রবাহ চলায় রাতের জোয়ারে কেউ বের হতে পারছেন না। তবে দিনের বেলা যতক্ষণ পারা যায় পুষিয়ে নিতে চেষ্টা করছেন তাঁরা। কারণ, এক দিন নদীতে জাল টানতে না গেলে তাঁদের সংসার চলে না। তাই শীত, বর্ষা, গ্রীষ্ম তাঁদের কাছে একই রকম মনে হয়।

সুন্দরবনসংলগ্ন মাটিয়াভাঙ্গা গ্রামে গিয়েও দেখা যায় একই চিত্র। কপোতাক্ষ নদে অনেক নারী-পুরুষকে দেখা গেল পিঠে দড়ি বেঁধে জাল টানতে। সেখানে শীতে কাঁপতে কাঁপতে জাল টানছিলেন বৃদ্ধ কওছার আলী। তাঁর কাছাকাছি এগিয়ে গেলে তিনি বলেন, ‘দুটো মাইয়ের বিয়ের পর থেইকে নিজির কামাই নিজি করি খাতি হয়। এক দিন গতর খাটাতি না পারলি বুড়ো-বুড়ির উপোস থাকতি হবে। তাই শীত লাগলিও ঘরের মধ্যি বইসি থাকপার উপায় নেই, বাবা।’

এসব গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, বেশির ভাগ মানুষ সকালের রোদে কাঁথা জড়িয়ে, ওড়না জড়িয়ে বা পুরান শাড়ি জড়িয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে। রাতের বেলা ত্রাণের কম্বলই ভরসা। আবার বাঁধের ওপর যেসব পরিবার বসবাস করছে, শীতে তাদের কষ্ট অনেক বেশি। এমনই একজন লেয়াকাত ঢালী। নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারানোর পর পরিবার নিয়ে বেড়িবাঁধের ঢালে দুটি খুপরিতে বাস করছেন। তিনি বলেন, ‘দিন-রাত নদীতে পোনা ধরে যা পাই, তা দিয়ে খাবার টাকাই জোগাড় হয় না। এ অবস্থায় শীতের কাপড় কেনা হয়ে ওঠে না। এখন তো আরও সমস্যা। দাম বাইড়ে যাওয়ায় চাল-ডাল কিনতিই সব টাকা শেষ হয়ে যায়।’

কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি বিদেশ রঞ্জন মৃধা বলেন, কয়রা উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন নদীতীরবর্তী ৩০টির মতো গ্রামের বাসিন্দাদের জীবিকার প্রধান উৎস নদীতে জাল টেনে পোনা ধরা। এসব গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ এ পেশায় জড়িত। তাদের কাছ থেকে ফড়িয়ারা পোনাগুলো সংগ্রহ করে স্থানীয় ঘেরমালিকদের কাছে বিক্রি করেন। এভাবে প্রতিদিন গড়ে একেকজন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আয় করেন। ওই টাকায় তাদের খাওয়া এবং পরার বন্দোবস্ত হয়। যাদের সংসার বড়, তাদের সমস্যা বেশি। প্রতিবছর সরকারি ও বেসরকারিভাবে এসব গ্রামে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়। কেনার সামর্থ্য না থাকায় বেশির ভাগ পরিবারের শীত কাটে ত্রাণের বস্ত্রে।