বাবা রাগ করে বাসা থেকে বেরিয়ে গেছেন। পাঁচ বছরের ছোট্ট মেয়েটি তা মেনে নিতে পারেনি। বাবাকে ফিরিয়ে আনতে চুপিচুপি তাঁর পিছু নেয় সে। কিন্তু কিছু দূর যাওয়ার পর বাবাকে হারিয়ে ফেলে। এরপর আর নিজের বাসার পথও খুঁজে পায়নি। এদিকে বৃষ্টি ঝরছিল। বাড়ছিল রাত। কাকভেজা শিশুটি চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানার সতীশ বাবু লেনে বসে শুধু কাঁদছিল। বারবার বলছিল, ‘আমার বাবাকে খুঁজে দিন।’
গত বৃহস্পতিবার রাত প্রায় ১১টার দিকে এক পথচারীর চোখে পড়ে শিশুটিকে। তিনি তাকে কোতোয়ালি থানায় নিয়ে যান। সেখান থেকেই শুরু হয় তার পরিবারকে খুঁজে বের করার চেষ্টা।
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু জায়েদ মো. নাজমুন নুর প্রথম আলোকে বলেন, থানায় আনার সময় শিশুটির চোখ ও নাক দিয়ে পানি ঝরছিল। বৃষ্টিতে ভিজে শরীর কাঁপছিল। সঙ্গে সঙ্গে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। ভেজা কাপড় বদলে শুকনা পোশাকও পরিয়ে দেওয়া হয়।
ওসি বলেন, শিশুটিকে জিজ্ঞাসা করলে সে শুধু মা–বাবার নাম বলতে পারছিল। কিন্তু বাসার ঠিকানা কিংবা আশপাশের কোনো পরিচিত স্থানের নাম বলতে পারেনি। বারবার একটাই অনুরোধ করছিল, ‘আমার বাবাকে খুঁজে দিন।’
শিশুটির পরিচয় জানতে তার ছবি তুলে নগরের বিভিন্ন থানায় পাঠানো হয়। কোথাও নিখোঁজ-সংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে কি না, সেটিও খোঁজ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শিশুটির ছবি প্রকাশ করা হয়। রাত পেরিয়ে পরদিন সকাল হলেও পরিবারের কেউ থানায় আসেননি।
এ সময় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী থানায় গিয়ে শিশুটির সঙ্গে কথা বলেন এবং দ্রুত তার পরিবারকে খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন। পরে শুক্রবার বিকেলে শিশুটির মা–বাবা থানায় এসে তাকে শনাক্ত করেন।
ওসি আবু জায়েদ মো. নাজমুন নুর বলেন, পারিবারিক কলহের জেরে বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে শিশুটির বাবা নগরের বাকলিয়া চাক্তাই এলাকার বাসা থেকে বেরিয়ে যান। বিষয়টি বুঝতে পেরে শিশুটিও বাবার পিছু নেয়। কিন্তু কিছু দূর গিয়ে বাবাকে হারিয়ে ফেলে। এরপর আর বাসার পথ চিনতে না পেরে কাঁদতে কাঁদতেই বৃষ্টির মধ্যে সতীশ বাবু লেনে এসে বসে ছিল। সেখান থেকেই এক পথচারী তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যান।
পুলিশ জানায়, শিশুটির বাবা দিনমজুর। শিশুটি স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় শিশু শ্রেণিতে পড়ে।
শিশুটির বাবা শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেয়ের ছবি দেখে এক পরিচিত ব্যক্তি তাঁকে ফোন করে জানান, তাঁর মেয়ে কোতোয়ালি থানা-পুলিশের কাছে আছে। খবর পেয়েই তিনি থানায় ছুটে যান।
শিশুটির বাবা বলেন, ‘বাসা থেকে ফোন পেয়ে দ্রুত ফিরে আসি। এরপর সারা রাত বিভিন্ন জায়গায় মেয়েকে খুঁজেছি। কোথাও পাইনি। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিটি দেখে জানতে পারি, সে নিরাপদে থানায় আছে। মেয়েকে আবার বুকে ফিরে পেয়েছি। যে পথচারী তাকে থানায় নিয়ে গেছেন এবং কোতোয়ালি থানা-পুলিশ যেভাবে মেয়ের যত্ন নিয়েছে, তাদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। তারা না থাকলে বড় ধরনের বিপদ ঘটতে পারত।’