পঙ্কজ নাথের দলীয় পদ ফিরে পাওয়া নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা, তবু উজ্জীবিত কর্মী-সমর্থকেরা

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান বরিশাল-৪ আসনের সংসদ সদস্য পঙ্কজ নাথ। বৃহস্পতিবার দুপুরে বরিশালের মুলাদী থানা চত্বরে
ছবি: প্রথম আলো

সংসদ সদস্য পঙ্কজ নাথের রাজনীতির দুর্ভাগ্য কেটে যাচ্ছে এবং তিনি দলীয় পদ ফিরে পেতে যাচ্ছেন বলে গুঞ্জন চাউর হচ্ছে তাঁর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে বরিশালের মুলাদীতে নতুন থানা ভবনের উদ্বোধন করতে এসেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। হেলিকপ্টার থেকে নামার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ফুলের তোড়া দিয়ে হাস্যোজ্জ্বল মুখে স্বাগত জানান পঙ্কজ নাথ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বেশ হাসিমুখে ফুলেল শুভেচ্ছা সাদরে গ্রহণ করেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে পঙ্কজ নাথের উজ্জ্বল হাসিমুখ দেখে তাঁর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে এমন আশার সঞ্চার হয়েছে। তবে দলীয় পদ ফিরে পাওয়া নিয়ে সুনির্দিষ্ট করে কিছু জানা যায়নি। ফলে এ নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। তবু উজ্জীবিত পঙ্কজ নাথের কর্মী-সমর্থকেরা।

পঙ্কজ নাথের নির্বাচনী এলাকা বরিশাল-৪ আসনটি মেহেন্দীগঞ্জ ও হিজলা দুটি উপজেলা নিয়ে গঠিত। পঙ্কজকে দলের সব পদ-পদবি থেকে গত বছরের সেপ্টেম্বরে অব্যাহতি দেওয়ার পর এলাকায় তাঁর সমর্থক নেতা-কর্মীরা ঝিমিয়ে পড়েছিলেন।

আশঙ্কা করা হচ্ছিল, তিনি আর রাজনীতির মাঠে দাঁড়াতে পারবেন না। আগামী নির্বাচনেও দলীয় মনোনয়নও হারাতে পারেন। কিন্তু সেই আশঙ্কা এখন অনেকটাই কেটে গেছে বলে মনে করছেন তাঁর কর্মী-সমর্থকেরা।

পঙ্কজের কর্মী-সমর্থকেরা বলছেন, কেন্দ্রীয় কমিটির নির্দেশে বরিশাল-৪ আসনের সংসদ সদস্য পঙ্কজ নাথকে দলীয় সব পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পর তাঁকে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছিল। তিনি তাঁর জবাব দিয়েছেন এবং একই সঙ্গে তাঁর ওপর দলীয় সিদ্ধান্ত বাতিল চেয়ে একটি আবেদনও করেছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে পঙ্কজ ও আবেদনকারী শতাধিক নেতা-কর্মীকে ক্ষমা করে দিয়েছেন দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত নভেম্বরে এমন ঘোষণা এসেছিল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে।

ওই সময় সংসদ সদস্য পঙ্কজ নাথ প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘আমাকে শোকজ দেওয়ার পর জবাব দিয়েছি এবং ক্ষমা চেয়ে সঙ্গে আবেদনও করেছিলাম।’ তবে ক্ষমা করার বিষয়টি পঙ্কজ নাথের বিষয়টির সঙ্গে সম্পর্কিত নয় বলে দাবি করেছিলেন মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র কামাল খান। কামাল খান বলেছিলেন, সংসদ সদস্য পঙ্কজ নাথকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়নি। তাঁকে দলীয় পদ-পদবি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আর যাঁদের ক্ষমা করা হয়েছে, তাঁরা দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিয়ে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন।

এমন পরিস্থিতিতে পঙ্কজ নাথ বিষয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি এখনো। বিষয়টি জানতে শনিবার সকালে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের বরিশাল বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আফজাল হোসেনের সৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পঙ্কজ নাথকে দলের সব পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এর আগে জেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়ার অনুরোধ করে কেন্দ্রে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যে আছে—পঙ্কজ নাথ নির্বাচনী এলাকা হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলায় দলের মধ্যে বিভেদ এবং নিজের বলয় তৈরি করতে পুরোনো ও ত্যাগী নেতা-কর্মীদের কোণঠাসা করে রেখেছেন। একই সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে দলীয় প্রার্থীর বাইরে স্বতন্ত্র প্রার্থী দেওয়া, নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের পরাজিত করতে খুন, দলীয় নেতা-কর্মীদের মারধর, কুপিয়ে জখম এবং জ্যেষ্ঠ নেতাদের অপমান-অপদস্থ করা।

পঙ্কজ নাথ স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন বলে মনে করেন তাঁর কর্মী-সমর্থকেরা। পদ-পদবি থেকে অব্যাহতির ঘোষণা আসার পর পঙ্কজ নাথ এলাকার রাজনীতিতে অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েন। জেলা আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেহেন্দীগঞ্জ ও হিজলার আওয়ামী লীগ নেতারা পঙ্কজকে ঠেকাতে এককাট্টা হন। তাঁর সমর্থক নেতা-কর্মীদের দলীয় পদ-পদবিও থেকে বাদ দেওয়া হয়।

গত বছরের নভেম্বরের প্রথম দিকে তিনটি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্মেলনে দাওয়াত পাননি পঙ্কজ। এমনকি বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এসব সম্মেলনে তাঁকে যোগ দিতেও বারণ করা হয়। একই সঙ্গে তাঁর সমর্থক নেতাদেরও এসব উপজেলা কমিটিতে রাখা হয়নি। কিন্তু পঙ্কজ নাথ হাল ছাড়েননি।

তিনি নেতা-কর্মী ছাড়াই এলাকায় নানা অনুষ্ঠান করে নিজের অবস্থান ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। ঘন ঘন এলাকায় এসে সরকারি ও নানা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তিনি বিচলিত নন, সেটা প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। দল থেকে তাঁকে ছুড়ে ফেলা হলেও সংসদীয় এলাকায় তিনি ভিন্ন কৌশলে টিকে আছেন। এর নেপথ্যে আছেন তিনটি উপজেলার অধিকাংশ জনপ্রতিনিধি। এর মধ্যে তাঁর সংসদীয় এলাকার ২১টি ইউনিয়নের ১৫ জন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, একজন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা পরিষদের চারজন ভাইস চেয়ারম্যান এবং সাতজন কাউন্সিলর রয়েছেন। তাঁদের নিয়েই পঙ্কজ নাথ দুঃসময়ে এলাকায় নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখছেন। কিন্তু পঙ্কজের বিরোধী শক্তিও হাল ছাড়েনি। তারাও চেষ্টা করছে পঙ্কজকে যেকোনো উপায়ে ঠেকাতে।

পঙ্কজ নাথ ২০১৪ ও ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ১২ বছর ধরে স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক পদে ছিলেন। ক্যাসিনো–কাণ্ডবিরোধী অভিযান চলাকালে ২০১৯ সালের অক্টোবরে স্বেচ্ছাসেবক লীগের তৎকালীন সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওছার ও সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ নাথকে ওই পদ থেকে সরিয়ে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক এক নেতাকে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির দায়িত্ব দেওয়া হয়। এমনকি সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির কার্যক্রম থেকেও বাদ দেওয়া হয়েছিল তাঁদের। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে কেন তাঁদের সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির কার্যক্রম থেকেও বিরত রাখা হয়েছিল, তা দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়নি। এরপর পঙ্কজ নাথ বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য পদে ছিলেন। পরে পদ থেকেও তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

পঙ্কজ নাথের বিরোধীদের মধ্যে অন্যতম মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র কামাল খান। গত বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া এবং ফুলেল শুভেচ্ছা জানানোর ঘটনায় ভিন্ন কোনো বার্তা আছে কি না জানতে চাইলে শুক্রবার দুপুরে কামাল খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এইটার ভেতর আর কী বার্তা দেখব?  তিনি (পঙ্কজ) এখনো সংসদ সদস্য। ওখানে জনপ্রতিনিধিদের এসপি সাহেব দাওয়াত দিয়েছেন। জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে যাবেন, এতে তো নতুন কিছু দেখছি না।’

পঙ্কজ নাথ দলীয় ক্ষমা পেয়েছেন—এমন গুঞ্জন আছে, এটা কীভাবে দেখছেন এমন প্রশ্নের জবাবে কামাল খানের সাফ জবাব, ‘তিনি মার্সি পেলে দলের কোনো স্টেটমেন্ট কি দেওয়া হতো না! কই আমরা তো এমন কিছু পাইনি। আমি যত দূর জানি তাঁর ওপর কেন্দ্রের দেওয়া আদেশ এখনো বলবৎ আছে।’

এ অবস্থায় কেন্দ্র পঙ্কজ নাথের প্রতি আবার সহানুভূতিশীল হলেও স্থানীয়ভাবে দল তাঁর বিরোধী। দলের মূল স্রোতের সবাই তাঁকে মেনে নেবে না বলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন। সে ক্ষেত্রে আগের মতো পঙ্কজের রাজনীতিতে ফেরা নিয়েও সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে পঙ্কজ নাথ প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাজনীতি একটি দীর্ঘমেয়াদি যাত্রা। এখানে উত্থান-পতন দুটিই থাকবে। তবে এখানে টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলার সুযোগ নেই। রাজনীতি হলো টেস্ট ম্যাচের মতো। টিকে থাকতে পারলে রান আসবেই। আমি রাজনীতির মধ্য দিয়েই বেড়ে উঠেছি, আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ আমার অস্থিমজ্জায় মিশে আছে। এখন এমপি হতে পারলাম কি পারলাম না, তা বড় কথা নয়। আমি রাজনীতিতে ছিলাম এবং থাকব।’
মেঘ কেটে গেছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে পঙ্কজ নাথ বলেন, ‘সবকিছুর সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক আপা (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা)। তাঁর প্রতি আমার অবিচল আস্থা, বিশ্বাস সবই আছে। তিনি যা করবেন, সেটাই আমি মেনে নেব।’