শহরে গিয়া ডাক্তারের কাছে অসুখ বোঝাতে পারি না। এখানে ডাক্তার সাহেব আমরার মনের কথা বোঝেন। সহজেই রোগ সেরে যায়। 
সুফিয়া বেগম, গৃহিণী, শঙ্করসেনা গ্রাম, শ্রীমঙ্গল 

সম্প্রতি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার আশিদ্রোন ইউনিয়নের শঙ্করসেনা গ্রামের নির্মাই শিববাড়ীতে গিয়ে এ চিত্র দেখা গেল। সেখানে সপ্তাহে এক দিন (প্রতি সোমবার) বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা পান চান মিয়ার মতো দরিদ্র মানুষেরা। দুই বছর ধরে গ্রামের মানুষদের এই সেবা দিচ্ছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বিভাগের সাবেক পরিচালক সত্যকাম চক্রবর্তী। 

স্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি সোমবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এখানে চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে বসেন সত্যকাম। প্রতি সপ্তাহে গ্রামের ৩০ থেকে ৪০ জন এখানে চিকিৎসাসেবা নেন। রোগী আসেন পাশের গ্রাম থেকেও।

চান মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা গ্রামের মানুষ, শহরে গিয়া ডাক্তার দেখাইতে অনেক খরচ হয়। যাওয়া-আসার ভাড়া, ডাক্তারের ফিস, কত কিছু লাগে। ডাক্তার সাহেব (সত্যকাম) এখানে প্রতি সোমবার আসেন। আমরা গ্রামের মানুষ এখন উনাকে দেখাই। ডাক্তার সাহেব থাকায় আমরার অনেক উপকার হইছে।’

প্রাচীন নির্মাই শিববাড়ী মন্দিরের সেবায়েত হিসেবে সত্যকাম চক্রবর্তীর পরিবারের সদস্যরা ছিলেন। এখন দায়িত্ব এসেছে তাঁর ওপর। সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পর দুই বছর ধরে তিনি এখানে বসছেন। শহরে বাস করলেও তাঁর বেড়ে ওঠা ওই গ্রামেই। সত্যকাম চক্রবর্তী বলেন, ‘আমি এই এলাকার সন্তান, চিকিৎসক ও মন্দিরের সেবায়েত হিসেবে আমার দায়বদ্ধতা আছে। সপ্তাহের প্রতি সোমবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এখানে আমি থাকি। সাধারণ মানুষকে চিকিৎসা দিয়ে থাকি। আমার এখানে দুটি কাজ হয়, প্রথমত এলাকার মানুষ আমার কাছ থেকে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার যে অধিকার সংরক্ষণ করেন, সেটা পূরণ করতে পারি। আর রোগী দেখার মধ্য দিয়ে মানুষকে সেবা করার মাধ্যমে আমি দেবতার আরাধনা করতে পারি।’

সত্যকামের এমন উদ্যোগে খুশি এলাকার মানুষেরাও। আশিদ্রোন ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. জয়নাল আবেদীন প্রথম আলোকে বলেন, সত্যকাম চক্রবর্তীর মতো বড় ডাক্তারের কাছ থেকে এই এলাকার গরিব মানুষের পক্ষে চিকিৎসাসেবা নেওয়া সম্ভব হতো না, যদি না তিনি বিনা মূল্যে চিকিৎসা দিতেন। সত্যকামের এই সেবায় তাঁরা সবাই খুশি। সাধারণ মানুষের জন্য এখানে চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপনের দাবি স্থানীয় ব্যক্তিদের।

সত্যকামের কাছ থেকে চিকিৎসা নিয়ে শঙ্করসেনা গ্রামের গৃহিণী সুফিয়া বেগম বলেন, ‘অসুখ হলে এখানে আসি। আমরা গরিব মানুষ, শহরে গিয়া ডাক্তারের কাছে অসুখ বোঝাতে পারি না। এখানে ডাক্তার সাহেব আমরার মনের কথা বোঝেন। সহজেই আমরার রোগ সেরে যায়।’

শিবমন্দিরে পূজা-অর্চনার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চিন্তা রয়েছে সত্যকাম চক্রবর্তীর। তিনি বলেন, মন্দিরে পূজা-অর্চনার পাশাপাশি মানুষ চিকিৎসাসেবা পাবে, কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে। বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে। এসব বিষয় যদি পরিকল্পনামাফিক বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে এর সুফল মানুষ অনন্তকাল পাবে। তিনি ব্যক্তি হিসেবে এখানে একা কাজ শুরু করেছেন। কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে বেশি কিছু করতে পারবেন না। যদি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এখানে কিছু করা যায়, তাহলে মানুষ উপকৃত হবে।