সাতসকালে সংসদ সদস্যের বাড়িতে কেন এত ভিড়

রাজশাহী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদ নিজ বাড়িতে দর্শনার্থীদের কথা শুনছেন। রোববার সকালে চারঘাট উপজেলার মাড়িয়া গ্রামেছবি: প্রথম আলো

বয়োজ্যেষ্ঠ নারী। এক চোখে দেখেন না। টেবিলের মাঝামাঝি ঝুঁকে সংসদ সদস্যকে (এমপি) কী যেন বোঝাচ্ছেন। তাঁর পাশেই মাথা ঢাকা কম বয়সী একটি মেয়ে। তাঁদের কথা শুনতে সংসদ সদস্য আবু সাইদ চাঁদও সামনের দিকে এগিয়ে এসেছেন। এরই মধ্যে ঘরে ফুল নিয়ে ঢুকে পড়েন একটি কলেজের ৫০ থেকে ৬০ শিক্ষক–কর্মচারী। ভিড়ের ভেতরে ওই নারীর আর কথা বলা হলো না। সংসদ সদস্য তাঁদের বাইরে বসতে বললেন।

বাইরে আসার পর ওই নারীর পরিচয় পাওয়া গেল। পাশে বসা তাঁর কিশোরী মেয়েটিকে বিয়ে দিয়েছিলেন। সংসার ভেঙে গেছে। বললেন, ‘মিয়ার বিয়া দিচুনু। তালাক দিচে। তাই চেয়ারম্যানের কাছে আইচি।’ আবু সাইদ চাঁদ তিনবার ইউনিয়ন পরিষদ ও দুবার উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন। গ্রামের মানুষ এখনো তাঁকে চেয়ারম্যান সম্বোধন করে কথা বলেন।

রাজশাহী–৬ (চারঘাট ও বাঘা) আসনের সংসদ সদস্য আবু সাইদ চাঁদ নির্বাচিত হওয়ার পর কেউ এসেছেন শুভেচ্ছা জানাতে, কেউ এসেছেন নিজের সমস্যা নিয়ে কথা বলতে, কেউবা চিকিৎসার খরচ নিতে। এসব নিয়ে তাঁর বাড়ির সামনে প্রতিদিন সকাল থেকে ভিড় লেগেই থাকছে। আজ রোববার সকালে আবু সাইদ চাঁদের গ্রামের বাড়ি গিয়ে এ দৃশ্য দেখা যায়।

আবু সাইদের বাড়ি চারঘাট উপজেলার শলুয়া ইউনিয়নের মাড়িয়া গ্রামে। তিনি ১৯৯১ সালে প্রথম ইউপি নির্বাচনে অংশ নেন। টানা তিনবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা দুবার চারঘাট উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে দল মনোনয়ন দিলেও উপজেলা চেয়ারম্যান থেকে জাতীয় নির্বাচনে দাঁড়ানোয় প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যায়। এবার তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। শপথ নেওয়ার পর গ্রামে ফিরে নিজের বাড়িতেই আছেন। প্রতিদিন সকালে বের হওয়ার আগে বাড়িতে মানুষের ঢল নামছে।

রাজশাহী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদের বাড়ির সামনে সকাল বেলায় দর্শনার্থীদের ভিড়। রোববার সকালে জেলার চারঘাট উপজেলার মাড়িয়া গ্রামে
ছবি: প্রথম আলো

লাঠিতে ভর দিয়ে খুব কষ্ট করে হাঁটতে হাঁটতে আসছিলেন কাজিম আলী (৬৫)। পেছনে তাঁর স্ত্রী তাঁকে ধরে হাঁটছেন। কী প্রয়োজনে এসেছেন জানতে চাইলে কাজিম আলী বলেন, তাঁরা মাড়িয়া গ্রামেরই মানুষ। তিনটা কেমোথেরাপি দিয়েছেন। টাকার জন্য আর দিতে পারছেন না। তাঁর ভাষায়, ‘আমাদেরই চেয়ারম্যান। আইচি কোনো ব্যবস্থা কইরি দেয় কি না।’ কিছুক্ষণ পরেই তিনি বাইরে এসে মাটিতে বসে পড়লেন। দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেন না। একটু পরে তাঁর স্ত্রী ভেতর থেকে এসে বলেন, ‘হইচে। চেয়ারম্যান একটা ব্যবস্থা কইরি দিলি।’

চারঘাট গুচ্ছ গ্রামের শওকত আলীর স্ত্রী শহরী বেগম (৬১) তাঁর প্রতিবন্ধী মেয়ে ও জামাইকে নিয়ে এসেছেন। শহরী বেগম অনবরত কাঁপছেন। বললেন, কিডনির অপারেশনের পর এ রকম হচ্ছে। চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে পারছেন না। তাঁদের ভ্যানচালক রেজাউল বলেন, ‘এরা সব মানসিক রোগী। মেয়েটা রান্না পর্যন্ত করতে পারে না। জামাই সব করে। এখন চিকিৎসার খরচের জন্য চেয়ারম্যান কিছু দিল, এই আরকি।’

কিছুক্ষণের মধ্যে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) বাঘা শাখার নেতারা দল ধরে এলেন। তাঁরা এলাকার জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত পুকুর খনন ইত্যাদি সমস্যা নিয়ে কথা বলেন। কমিটির সভাপতি আবদুস সালাম বলেন, ‘এমপি সাহেব আমাদের কথা শুনেছেন। পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। কোনো নেতার বিপক্ষে গেলেও তিনি বাপার সঙ্গে থাকবেন বলে জানিয়েছেন।’

এরপর ডাকরা ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক–কর্মচারীরা ফুল নিয়ে হাজির। তাঁদের ফুল নিয়ে আবু সাইদ চাঁদ বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা পড়ার টেবিলে নাই। তাদের ফিরাইয়ে আনতে হবে। এটাই আমার দাবি।’ একটি পরিবারের নারী–পুরুষ সব সদস্যই এসেছেন। তাঁদের একটা সালিস হয়েছিল আগে। বাদীপক্ষ সালিসনামা জমা না দেওয়ার কারণে তাঁদের একজনকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে।

সব শুনছেন সংসদ সদস্য আবু সাইদ চাঁদ। প্রয়োজনে ফোন করে দিচ্ছেন। একের পর এক মানুষ এভাবে আসছেন। কথা হচ্ছে। এক দল চলে যাচ্ছে। আরেক দল আসছে। এই ভিড় দেখে এক যুবক বলতে বলতে বাইরে গেলেন, ‘কাজের লোকের চেয়ে অকাজের লোক বেশি আইসি ঝামেলা করতিচে।’