সুন্দরবনে বাঘের থাবায় স্বামীহারা নারীদের লড়াই
কোনো এক পবিত্র রমজান মাসে স্বামী আমীর আলী সুন্দরবনে গোলপাতা কাটতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে নিহত হন। সেই ঘটনার পর কেটে গেছে বহু বছর। কিন্তু স্বামীহারা সেই দিনের স্মৃতি আজও তাড়া করে ফেরে আছিয়া খাতুনকে। খুলনার কয়রা উপজেলার কুশোডাঙা গ্রামের বাসিন্দা তিনি। তাঁর কণ্ঠে ক্লান্তি, চোখে দুঃখের ছাপ। তিনি বলেন, ‘কীভাবে যে বাঁইচে আছি, তা আমিই জানি। গ্রামে গ্রামে ঘুইরে ভিক্ষা করি আইনে এতিম তিন মাইয়ার মুখে দুমুঠো ভাত তুলি দিছি।’
রোববার কয়রা উপজেলার কপোতাক্ষ মহাবিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে নিহত জেলে ও বাওয়ালিদের স্ত্রীদের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ অনুষ্ঠানে গিয়ে আছিয়া খাতুনসহ আরও অনেক বিধবা নারীর সঙ্গে কথা হয়।
কথায় কথায় আছিয়া খাতুন বলেন, ২০০০ সালের রমজান মাসে মহাজনের তত্ত্বাবধানে বড় একটি নৌকায় করে তাঁর স্বামী আমীর আলী, ভাই ওমর আলীসহ ১২ জনের একটি বাওয়ালি দল গোলপাতা কাটতে সুন্দরবনে যান। টানা আট দিন গোলপাতা কেটে নৌকা বোঝাই করেন তাঁরা। পরের দিন ঘন বনের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে বাঘের থাবায় আমীর আলী মারা যান।
আছিয়া খাতুন বলেন, ‘আমি দিকিলাম স্বামীর লাশ ঘরের সামনে শোয়ানি। তারপর আর কিচ্ছু মন নেই। কাঁনতি কাঁনতি অজ্ঞান হুয়ি গেলাম। ভোরে জানাজা শেষে কবর দেয়া হুলো। এরপর তিন মাইয়ে নে শুরু হুলো আমার আরেক রকম জীবন। মানষির সাহায্য নে মাইয়াগে বড় করেছি, বিয়াও দিছি।’
আছিয়া খাতুনের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন আরেক বিধবা মোমেনা বেগম। তাঁর বাড়ি কয়রার মাটিয়াভাঙা গ্রামে। ২০১২ সালে রোজার ঈদের কয়েক দিন পর ভোরে সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে নিহত হন তাঁর স্বামী আতিয়ার মোল্লা।
মোমেনা বেগম বলেন, ‘ভাগ্য মাইনে নিছি। অনেক কষ্টে একমাত্র মাইয়েডারে বিয়ে দিছি। বন বিভাগ থেইকে আমারে একখান বিএলসি (বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট) দেছিল। দীর্ঘদিন নিজি সুন্দরবনে গে কাঁকড়া ধরিছি। এখন বয়স হইছে, আর পারিনে। এইজন্যি এক জাইলের কাছে লাইসেন্সখান ভাড়া দিছি, সাত দিনে ৩০০ টাকা পাই।’
আরেক বাঘবিধবা কদবানু বিবির গল্প আরও করুণ। কয়রার চৌকুনি গ্রামের বাসিন্দা তিনি। কদবানু বলেন, তাঁর স্বামী এনছার আলী মোল্লা একদল বাওয়ালীর সঙ্গে গোলপাতা কাটতে গিয়েছিলেন। কাজ শেষে সবাই যখন নৌকায় উঠতে প্রস্তুত, তখন দলের এক তরুণ সদস্য একটি ভালো কাঠের গাছ দেখে সেটি কেটে বাড়িতে নেওয়ার কথা বলেন। তরুণটির অনুরোধ ফেলতে পারেননি এনছার আলী। অন্যরা নৌকায় উঠে গেলেও তিনি গাছ কাটতে থেকে যান। হঠাৎ বনের ভেতর থেকে বাঘ এনছার আলীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তিনি মারা যান।
কদবানু বলেন, ‘স্বামীর মৃত্যুর পর চার সন্তান নিয়া শুরু হয় আমার কষ্টের জীবন। মানষির বাড়ি কাজনকাম কইরে সন্তানগের বড় করিছি। কিন্তু কপাল আমার ভালো ছিল না। স্বামী মইরে যাওয়ার ১৫ বছর পর সুন্দরবনে মাছ ধরতি গিয়া নিখোঁজ হয় আমার বড় ছাওল। তার আর খোঁজ পাইনি। পরে আরও এক ছাওল মইরে গেছে। এখন এই বুড়ো বয়সে ছোট মাইয়ে রেক্সোনার সংসারে থাকি।’
ইনিশিয়েটিভ ফ্রেমওয়ার্ক ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের উদ্যোগে সুবিধাবঞ্চিত বিধবা পরিবারের মধ্যে ইফতার ও ঈদবাজার বিতরণ করা হয়। এর ইভেন্ট পার্টনার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইনিশিয়েটিভ ফর কোস্টাল ডেভেলপমেন্ট (আইসিডি)। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল্লাহ আল বাকী, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের পরিচালক আমিরুল ইসলাম কাগজী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইনিশিয়েটিভ ফর কোস্টাল ডেভেলপমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা মো. আশিকুজ্জামানসহ স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা।