‘বানিয়াচং থানা কিন্তু আমরা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম, এসআই সন্তোষকে কিন্তু জ্বালাই দিয়েছিলাম’
হবিগঞ্জে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগ নেতা এনামুল হাসান ওরফে নয়নকে আটকের ১৫ ঘণ্টা পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের চাপে পুলিশ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বিকেলে শায়েস্তাগঞ্জ থানায় এ ঘটনা ঘটে। থানা ঘেরাও করে রাখা ছাত্রনেতাদের সঙ্গে পুলিশের বাগ্বিতণ্ডার একটি ভিডিও সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে বানিয়াচং থানায় আগুন দিয়ে এক পুলিশ সদস্যকে পুড়িয়ে হত্যার কথা বলতে শোনা যায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক নেতাকে।
এনামুল হাসানকে ছাড়িয়ে নেওয়ার বিষয়ে জেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের ভাষ্য, এনামুল একসময় ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও পরে তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকে জড়ান। আর পুলিশের ভাষ্য, আটক ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়ায় তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শায়েস্তাগঞ্জ সদর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সহসভাপতি এনামুল হাসানকে গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে শায়েস্তাগঞ্জ থানার পুলিশ আটক করে থানায় নিয়ে আসে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিলেন। এনামুলকে আটকের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলার নেতা-কর্মীরা তাঁর মুক্তির দাবিতে গতকাল দুপুরে থানা ঘেরাও করেন। এ সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্র অধিকার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মাহদী হাসানের নেতৃত্বে একদল নেতা-কর্মী ওসির কক্ষে অবস্থান নেন। তাঁরা দাবি করেন, এনামুল হাসান একসময় ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও পরে তিনি জুলাই আন্দোলনে জড়িত হন। তাঁরা এনামুলকে ছেড়ে দেওয়ার দাবি করেন।
বানিয়াচং থানা কিন্তু আমরা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম, এসআই সন্তোষকে কিন্তু আমরা জ্বালাই দিয়েছিলাম। ওই জায়গা থেকে উনি (ওসি) কোন সাহসে এটা (আন্দোলনকারী হয়েছে তো কী হয়েছে) বললেন। আমি স্ট্রিকলি এখানে আসছি। আমরা এতগুলা ছেলে ভাইসা আসছে নাকি?
সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসি আবুল কালামের সঙ্গে মাহদী হাসান কথা বলছেন। মাহদীকে বলতে শোনা যায়, ‘জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা সরকার গঠন করেছি। এই জায়গায় আপনারা আমাদের প্রশাসনের লোক। আপনারা আমাদের ছেলেদের গ্রেপ্তার করে নিয়ে এসেছেন। আবার আমাদের সঙ্গে বার্গেনিং করছেন। আপনি (ওসি) বলেছেন, “আন্দোলনকারী হয়েছে তো কী হয়েছে? ”’ একপর্যায়ে মাহদী হাসান ওসিকে বলেন, ‘বানিয়াচং থানা কিন্তু আমরা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম, এসআই সন্তোষকে কিন্তু আমরা জ্বালাই দিয়েছিলাম। ওই জায়গা থেকে উনি (ওসি) কোন সাহসে এটা (আন্দোলনকারী হয়েছে তো কী হয়েছে) বললেন। আমি স্ট্রিকলি এখানে আসছি। আমরা এতগুলা ছেলে ভাইসা আসছে নাকি?’
খবর পেয়ে বেলা তিনটার দিকে হবিগঞ্জ সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শহীদুল ইসলাম শায়েস্তাগঞ্জ থানায় ছুটে যান। তাঁর মধ্যস্থতায় বেলা সাড়ে তিনটার দিকে এনামুল হাসানকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। এ বিষয়ে জানতে তাঁর মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার কল করা হলে তিনি সাড়া দেননি। ক্ষুদেবার্তার জবাবও দেননি।
এ বিষয়ে মাহদী হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আটক হওয়া ছাত্র নেতা একসময় ছাত্রলীগ করলেও তিনি জুলাই আন্দোলনে আমাদের সঙ্গে সক্রিয় ছিলেন। শুধু তাঁর অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য পুলিশ তাকে আটক করে নিয়ে আসে।’ মাহদী প্রশ্ন তোলেন, ‘আমাদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে মূল সমন্বয়কারীদের একজন সারজিস আলম। তিনিও তো একসময় ছাত্রলীগ করেছেন। তাহলে তিনিও কি অপরাধী?’ তিনি দাবি করেন, শায়েস্তাগঞ্জ থানার পুলিশ আগেও অপরাধ করেছে তাঁদের তিন নেতা-কর্মীকে আটক করে।
আজ শনিবার সকালে হবিগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপারের বরাত দিয়ে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এনামুল হাসানকে শায়েস্তাগঞ্জ থানা-পুলিশ সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করে। পরবর্তী সময়ে জিজ্ঞাসাবাদে তাঁর কোনো অপরাধের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। পরে তাঁর অভিভাবকের জিম্মায় তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনার বিষয়ে শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসি আবুল কালাম বলেন, ‘এখানে আমাদের কোনো অপরাধ ছিল না। আটকের পর যা হয়েছে, তা দেশবাসী দেখেছেন। সবার হাতে হাতে সে ভিডিও প্রচার হয়েছে। তারাই ভিডিও করেছে, আবার তারাই ছেড়েছে। এ সঙ্গে পুলিশের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কেউ অপরাধ করে থাকলে তাকে শাস্তি পেতেই হবে।’
ওসি আবুল কালাম আজ দুপুরে আরও বলেন, ‘আমরা তাঁকে (এনামুল) বৈষম্যবিরোধী একটি মামলায় সন্দেহভাজন ও ছাত্রলীগের সাথে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে আটক করি। ওই দিন রাত বেশি হওয়ায় আমরা যাচাই-বাছাই করতে পারিনি। পরদিন নানাভাবে তথ্য নিয়ে আমরা জানতে পেরেছি, আটক হওয়া ব্যক্তি কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত নয়। পরে তাঁকে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’