কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আসমা সাদিয়ার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো কিছু দিয়ে ২০টির বেশি আঘাতের চিহ্ন দেখতে পেয়েছেন ময়নাতদন্তকারীরা। আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল মর্গে লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়। এরপর পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করে পুলিশ। পরে পরিবারের সদস্যরা লাশ কুষ্টিয়া শহরের বাসায় নিয়ে যান।
ময়নাতদন্ত করেন কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) হোসেন ইমাম। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন চিকিৎসা কর্মকর্তা রুমন রহমান ও সুমাইয়া।
আরএমও হোসেন ইমাম প্রথম আলোকে বলেন, নিহত শিক্ষকের গলার নিচে সজোরে আঘাত করা হয়েছে। এতে গভীর ক্ষত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এতেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া বুক, পেট, হাত–পাসহ বিভিন্ন স্থানে অন্তত ২০টি আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। তাতে মনে হয়েছে, ঘটনার সময় ধস্তাধস্তি হয়েছে। বাঁচার জন্য শিক্ষক হাত দিয়ে ঠেকাতে গেছেন, এতে হাতেও আঘাত লেগেছে। যেভাবে আঘাত করা, তা খুবই ক্ষোভ ও আক্রোশের বহিঃপ্রকাশ মনে হচ্ছে।
গতকাল বুধবার বিকেল চারটার দিকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া নিহত হন। একই সময় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের কর্মচারী ফজলুর রহমানকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
আসমা সাদিয়ার লাশ জোহরের নামাজের পর কুষ্টিয়া ঈদগাহ মাঠে জানাজার জন্য নেওয়া হবে। সেখানে জানাজা শেষে লাশ কুষ্টিয়া পৌর গোরস্তানে দাফন করা হবে।
থানায় চারজনের নামে এজাহার
এদিকে নিহত শিক্ষকের স্বামী ইমতিয়াজ সুলতান হত্যার ঘটনায় থানায় এজাহার জমা দিয়েছেন। গতকাল বুধবার গভীর রাতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় এজাহারটি জমা দিয়েছেন বলে আসমার মামা সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, এজাহারে অভিযুক্ত ফজলুর রহমান, সমাকল্যাণ বিভাগের দুজন শিক্ষকসহ চারজনকে আসামি করা হয়েছে।
কুষ্টিয়া পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অবস) ফয়সাল মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটা এজাহার পাওয়া গেছে। মামলার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।’
মর্গের সামনে কথা নিহত শিক্ষকের স্বামী ইমতিয়াজের বড় ভাই আবদুর রশিদ ও শফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তাঁরা বলেন, আসমার ছোট ছোট চারটি বাচ্চা। দুটি বাচ্চা এখনো বুঝতে পারেনি তাদের মা নেই। ছোট বাচ্চাটির বয়স মাত্র দেড় বছর।
শফিকুল ইসলাম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমাদের পুরো পরিবার ধ্বংস করে দিল। আসমার বিভাগের নানা আর্থিক বিষয়ে ফজলুর সঙ্গে দ্বন্দ্ব ছিল। ফজলু নানা বিষয়ে চাপ দিত। এ নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রশাসনের কেউ কেউ জানত। বৈঠকও হয়েছে। কারও ইন্ধন ছাড়া এত বড় ঘটনা ঘটতে পারে না। এত বড় সাহস হতে পারে না। পরিকল্পিতভাবে সবকিছু করা হয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে শিক্ষকেরাও জড়িত। এ জন্য মামলায় তাদের আসামি করা হয়েছে।’
আবদুর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘কর্মস্থলে শিক্ষককে নৃশংসভাবে হত্যা করা হবে—এটা মেনে নেওয়া যায় না। এ ঘটনার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাঘববোয়ালেরা জড়িত। তাদের খুঁজে বের করতে হবে প্রশাসনকে।’
বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
আসমা সাদিয়াকে হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন শিক্ষার্থীরা। আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনের সামনে এ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন তাঁরা। এ সময় তাঁরা দ্রুত হত্যাকারীর ফাঁসি নিশ্চিত ও এর নেপথ্যের কারণ বের করার দাবি জানান।
এর আগে সকাল ১০টার দিকে থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদের সামনে মানববন্ধন করেন শিক্ষার্থীরা। পরে তাঁরা সেখান থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে প্রশাসন ভবনের সামনে এসে জড়ো হন।
এ সময় আন্দোলনকারীরা ৯ দফা দাবি জানান। দাবিগুলো হলো—হত্যাকারীর ফাঁসি জনসমক্ষে অতিদ্রুত সময়ের মধ্যে নিশ্চিত করা, হত্যার নেপথ্যের কেউ থাকলে জবাবদিহিতে নিয়ে এসে তার বিচার নিশ্চিত করা, ক্যাম্পাসে-হলে-ডিপার্টমেন্টে সিসি ক্যামেরা নিশ্চিত করা এবং তা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে কেন্দ্রীয় সার্ভারে সংরক্ষণ করা, স্মার্ট আইডি ছাড়া কাউকে ক্যাম্পাসে ঢুকতে না দেওয়া, ডেইলি বেসিস কর্মচারীদের নেমপ্লেটসহ আলাদা পোশাকের ব্যবস্থা করা এবং তাদের বেতন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে দেওয়ার ব্যবস্থা করা, বিভাগীয় আয়–ব্যয়ের হিসাব পরিষ্কার রাখা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসা এবং ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা।
সমাজকল্যাণ বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাদিয়া সাবরিনা বলেন, ‘আমরা ম্যামের হত্যাকারীর ফাঁসির দাবিতে এখানে এসেছি। ম্যাম আমাদের বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন। একজন কর্মচারী কতটা উগ্র হলে রুমে ঢুকে তাঁকে হত্যা করতে পারে! এ ঘটনার সাক্ষী অনেকেই আছেন, তাই আমরা এ হত্যাকাণ্ডের সুষ্টু বিচারের দাবি জানাই।’