শত বছর ধরে পথচারীদের জন্য ইফতারের আয়োজন করা হয় গ্রামের মসজিদটিতে

শরীয়তপুর সদর উপজেলার বুড়িরহাট জামে মসজিদে ১১৯ বছর ধরে রোজার মাসে পথচারীদের জন্য ইফতারের আয়োজন করা হচ্ছেছবি: প্রথম আলো

মসজিদটির বয়স প্রায় ১২০ বছর। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই মসজিদে প্রতি রমজান মাসে পথচারীদের জন্য ইফতারের আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পথচারী, শ্রমজীবী ও মুসল্লিরা প্রতিদিন এখানে একসঙ্গে বসে ইফতার করেন। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই আয়োজন এলাকায় সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বন্ধনকে দৃঢ় করেছে। এই চিত্র বুড়িরহাট জামে মসজিদে। শরীয়তপুর সদর উপজেলার বুড়িরহাট এলাকায় গত শতকের একেবারে শুরুর দিকে এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শরীয়তপুর সদর উপজেলার বুড়িরহাট গ্রামটি একসময় হিন্দু–অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। সেখানে বসবাসকারী মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের নামাজ আদায়ের জন্য কোনো মসজিদ ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে ওই এলাকার মুন্সী ও হাওলাদার পরিবারের উদ্যোগে ১৯০৭ সালে একটি মসজিদ স্থাপন করা হয়। প্রথম দিকে গোলপাতা দিয়ে অস্থায়ী একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়। সেখানেই ওই এলাকা ও আশপাশের এলাকার মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ মসজিদটিতে নামাজ আদায় করতেন। তখন থেকেই রমজান মাসে মসজিদটিতে পথচারীদের জন্য ইফতারের আয়োজন করা হতো। স্থানীয় বাসিন্দারা ওই আয়োজনটি ১১৯ বছর ধরে করে আসছেন।

১৯৩৫ সালে স্থানীয় মুন্সি ও হাওলাদার পরিবারের উদ্যোগে এক একর জমির ওপর মসজিদটি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। দিল্লির একটি মসজিদের আদলে একতলা পাকা ভবনের এই মসজিদ ও একটি মিনার নির্মাণ করা হয়। ১৯৭৮ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জে একটি অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে বুড়িরহাটের ওই মসজিদে নামাজ আদায় করেন।

বুড়িরহাটের প্রাচীন এই মসজিদে জিয়াউর রহমানের পরিদর্শন করার কথা নিশ্চিত করে শরীয়তপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সরদার নাসির উদ্দিন (কালু) প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওই দিন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে আমি সফরসঙ্গী হিসেবে উপস্থিত ছিলাম। এমন একটি অজপাড়াগাঁয়ে দৃষ্টিনন্দন একটি সমজিদ দেখে তিনি অভিভূত হন ও প্রশংসা করেন। আর এর উন্নয়নে সব সময় আমাদের কাজ করার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন। আমরা সব সময় মসজিদটির উন্নয়নের খোঁজ রাখছি। এখন যেহেতু একটি দায়িত্ব পেয়েছি, তাই অবকাঠামোগত উন্নয়নে আরও ভূমিকা রাখতে পারব।’

শরীয়তপুর সদর উপজেলার বুড়িরহাট জামে মসজিদ
ছবি: প্রথম আলো

মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্যরা জানান, রমজান মাস এলেই মসজিদ প্রাঙ্গণ জমে ওঠে রোজাদারদের পদচারণে। স্থানীয় দানশীল ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও প্রবাসীদের সহযোগিতায় প্রতিদিন ইফতার প্রস্তুত করা হয়। খেজুর, ছোলা, মুড়ি, খিচুড়ি, ফল, শরবতসহ নানা আয়োজন থাকে। শ্রমজীবী মানুষ, পরিবহন শ্রমিক ও পথচারীরা ওই ইফতারে অংশ নেন। প্রতিদিন ৪০০ হতে ৫০০ মানুষ মসজিদে বসে একসঙ্গে ইফতার করেন।

শরীয়তপুর ডামুড্যা উপজেলার তিলই গ্রামের বাসিন্দা মোবারক হোসেন বুড়িরহাট বাজারে শ্রমিকের কাজ করেন। তিনি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বাজারে কাজ করার কারণে ইফতারের সময় বাড়ি যেতে পারেন না। এই মসজিদে বসে ইফতার করেন। প্রথম আলোকে মোবারক বলেন, ‘১০ বছর ধরে আমি বুড়িরহাট বাজারে কাজ করছি। আর এ ১০ বছর ধরেই ইফতারের সময় মসজিদে আসি। সবার সঙ্গে বসে ইফতার করছি।’

মসজিদটির ইমাম হিসেবে দায়িত্বে আছেন সাব্বির আহমদ। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘মসজিদের পাশে মাদ্রাসা রয়েছে। আমরা যারা মসজিদ ও মাদ্রাসায় আছি, তারা মিলে ইফতার তৈরি ও পরিবেশনের কাজটি করছি।’

উপজেলার রুদ্রকর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মহব্বত খান জানান, এলাকার মানুষের সহায়তায় ইফতারের আয়োজনটি করা হয়। কোনো দিন খিচুড়ি, কোনো দিন বিরিয়ানি থাকে। সঙ্গে নানা ধরনের দেশি ফলমুল রাখা হয়।

মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষেরা মসজিদটি স্থাপন করেছেন। তাঁরাই রোজার সময় এখানে ইফতারের আয়োজন করার প্রথা চালু করেছেন। এখনো আমরা তা চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা যত দিন আছি, এমন আয়োজন করে যাব। পরবর্তী প্রজন্ম এই সম্প্রীতির বন্ধন টিকিয়ে রাখবে কি না, তা জানি না।’