চট্টগ্রাম বিভাগে অনুমোদন ছাড়াই চলছে ২৪০ হাসপাতাল-ল্যাব
একটিমাত্র কক্ষ নিয়ে গড়ে উঠেছে চট্টগ্রামের পটিয়া সদরের পপুলার হেলথ কেয়ার সেন্টার নামের রোগ নির্ণয়কেন্দ্রটি (ল্যাব)। একটি বড় কক্ষকে কাচ দিয়ে তিনটি ছোট কামরা করা হয়েছে। একটিতে এক্স–রে যন্ত্র, আরেকটিতে আলট্রাসনোগ্রাফি টেবিল। শৌচাগারের পাশে অপর কামরায় নমুনা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। পরিবেশও অপরিচ্ছন্ন, নোংরা। স্থায়ী কোনো ল্যাব টেকনোলজিস্ট নেই, নেই নিবন্ধনও। এভাবেই প্রায় ১০ বছর ধরে চলছে রোগ নির্ণয়কেন্দ্রটি।
পপুলার হেলথ কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থাপক ইকবাল হোসেন বলেন, ‘আমাদের এখানে এখন আগের মতো ব্যবসা নেই। সে কারণে একটু ঢিমেতালে চলছে। দুজন অস্থায়ী টেকনোলজিস্ট আছেন। লাইসেন্সের আবেদন করা আছে।’
চট্টগ্রাম বিভাগে এ রকম ২৪০টি বেসরকারি হাসপাতাল ও রোগ নির্ণয়কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদনহীন বা নিবন্ধিত না হয়েও চলছে। পর্যাপ্ত চিকিৎসক, টেকনোলজিস্ট, এমনকি যন্ত্রপাতিও নেই এসব চিকিৎসাকেন্দ্রে। সবচেয়ে বেশি অনিবন্ধিত হাসপাতাল ও রোগ নির্ণয়কেন্দ্র রয়েছে কুমিল্লায়, ১৩৭টি।
তালিকাভুক্ত কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অতীতে ভুল চিকিৎসা কিংবা ভুল রিপোর্ট প্রদানের অভিযোগও রয়েছে। তারপরও দিনের পর দিন এসব প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ। তবে সিভিল সার্জন কার্যালয়গুলোর দাবি, এ ধরনের অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর বাড্ডায় ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে খতনার পর শিশু আয়ানের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে করা এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৫ জানুয়ারি সারা দেশে লাইসেন্স ও অনুমোদনহীন হাসপাতাল ও রোগ নির্ণয়কেন্দ্রের তালিকা এক মাসের মধ্যে দাখিলের নির্দেশ দেন আদালত। এরপর তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ৮ ফেব্রুয়ারি ১১টি জেলার সিভিল সার্জন বরাবর চিঠি দিয়েছেন। এতে অনুমোদনহীন ও অনিবন্ধিত চিকিৎসাকেন্দ্রের তালিকা এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত নির্দেশনা প্রেরণ করা হয়। ওই নির্দেশনায় অনিবন্ধিত বা লাইসেন্সবিহীন বেসরকারি হাসপাতাল, রোগ নির্ণয়কেন্দ্র, ব্লাডব্যাংকের সব কার্যক্রম ১০ কার্যদিবসের মধ্যে বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়। এর আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে অনিবন্ধিত হাসপাতাল ও রোগ নির্ণয়কেন্দ্র বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ইফতেখার আহমেদ বলেন, ‘আমরা নির্দেশনা অনুযায়ী তালিকা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট সিভিল সার্জনদের দিয়েছি। তাঁরা এ ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এই তালিকায় যারা দীর্ঘদিন ধরে লাইসেন্স না নিয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে, তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের তালিকায় দেখা যায়, ১১৮টি হাসপাতাল ও ১২২টি রোগ নির্ণয়কেন্দ্রকে অননুমোদিত বা অনিবন্ধিত হিসেবে তারা চিহ্নিত করেছে। ১১ জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠান রয়েছে কুমিল্লায়। জেলাটিতে ৭২টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ৬৫টি রোগ নির্ণয়কেন্দ্র অনিবন্ধিত।
এর আগে গত কয়েক বছরে কুমিল্লার বেশ কয়েকটি হাসপাতালের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে ফাতেমা ক্লিনিক, টাওয়ার হসপিটাল, তিতাস মেডিকেল সেন্টার উল্লেখযোগ্য। এসব প্রতিষ্ঠানের নাম বর্তমান তালিকায় নেই।
জানতে চাইলে কুমিল্লা জেলার ডেপুটি সিভিল সার্জন মুহাম্মদ নাজমুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন ছাড়া চলছে, সেসব বন্ধ করার জন্য নির্দেশ এসেছে। আমরা সেই অনুযায়ী কাজ করছি। যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় অভিযোগ এসেছিল, সেগুলো আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাই নতুন তালিকায় নেই।’
তালিকায় দেখা যায়, কুমিল্লার পরই ২৩টি প্রতিষ্ঠান অনিবন্ধিত রয়েছে কক্সবাজার জেলায়। এর মধ্যে হাসপাতাল ১০টি। চট্টগ্রাম জেলায় অনিবন্ধিত হাসপাতাল ৬টি ও রোগ নির্ণয়কেন্দ্র ১১টি। এ ছাড়া চাঁদপুরে ৫টি হাসপাতাল ও ১০টি রোগ নির্ণয়কেন্দ্র অননুমোদিত বলে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম নগরের বন্দরটিলা ন্যাশনাল চক্ষু হাসপাতালটি প্রায় ১০ বছর ধরে অনুমোদনহীনভাবে চলে আসছে। এখানে চিকিৎসকের সহকারীদের দিয়ে চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগ অনেক পুরোনো। এবার প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করার তালিকায় রাখা হয়েছে।
রাঙামাটিতে সাতটি রোগ নির্ণয়কেন্দ্র বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। জানতে চাইলে রাঙামাটির সিভিল সার্জন নিহার রঞ্জন নন্দী প্রথম আলোকে বলেন, ‘কিছু প্রতিষ্ঠানের তালিকা দিয়েছে। তাদের কাগজপত্র দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা আগেও অভিযান পরিচালনা করেছি।’
অন্যান্য জেলার অনিবন্ধিত হাসপাতাল ও রোগ নির্ণয়কেন্দ্রের মধ্যে নোয়াখালীতে ১৫টি, ফেনীতে ২টি, চাঁদপুরে ১৫টি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৮টি, লক্ষ্মীপুরে ১৬টি প্রতিষ্ঠান অনিবন্ধিত তালিকায় রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কমিটি চট্টগ্রামের সদস্যসচিব সুশান্ত বড়ুয়া বলেন, অনুমোদনহীন অবস্থায় ল্যাব ও হাসপাতালগুলো চলছে। এগুলো বন্ধ করে দেওয়া উচিত। এতে স্বাস্থ্যসেবার নামে প্রতারণা কমবে।
পাশাপাশি আগে হাসপাতাল বা ল্যাব চালু করার পর লাইসেন্স দেওয়ার পদ্ধতিটা নিয়েও ভাববার সময় এসেছে। লাইসেন্সের আবেদন করে বছরের পর বছর ধরে হাসপাতাল চালানো হচ্ছে। এটারও পরিবর্তন দরকার।