রাউজানে হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বাড়িতে আগুন, রাঙামাটিতে গ্রেপ্তার ঘটনার মূল হোতা
চট্টগ্রামের রাউজানে বাইরে থেকে ঘরের দরজা আটকে হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বাসিন্দার পাঁচটি বসতঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনায় মূল হোতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শত্রুপক্ষের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টায় এসব ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে গ্রেপ্তার ওই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পেরেছে পুলিশ।
রাঙামাটি জেলা শহরের কলেজ গেট এলাকা থেকে গত শুক্রবার রাতে মো. মনির হোসেন (৩৪) নামের ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁর বাড়ি জেলার লংগদু উপজেলার শেখপাড়া গ্রামে।
গতকাল শনিবার গভীর রাতে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ এ তথ্য জানিয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, শুক্রবার দুপুরে রাঙামাটি কলেজ গেট এলাকা থেকে অগ্নিসংযোগের ঘটনার মূল হোতা মো. মনির হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁর বসতঘর তল্লাশি করে তিনটি খালি প্লাস্টিকের বস্তা উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থলে ব্যবহৃত ব্যানারের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ প্লাস্টিকের বস্তার সাদৃশ্য রয়েছে।
প্রাথমিকভাবে মনিরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ জানতে পেরেছে, তিনি পরিকল্পিতভাবে মানুষের বসতঘরে অগ্নিসংযোগ করেছেন। এ ঘটনার মাধ্যমে একদিকে সম্প্রীতি বিনষ্ট, অপর দিকে শত্রুপক্ষের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জড়িত অন্যদের বিষয়ে মনির হোসেন পুলিশকে তথ্য দিয়েছেন।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সম্প্রতি চট্টগ্রাম জেলার রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া থানা এলাকায় গভীর রাতে বিভিন্ন ব্যক্তির বসতঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। প্রতিটি ঘটনাস্থল থেকে বিশেষ ধরনের উসকানিমূলক ব্যানার উদ্ধার করা হয়। ব্যানারগুলোয় সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্টে উসকানিমূলক বক্তব্য, বিভিন্ন ব্যক্তির নাম ও একাধিক মুঠোফোন নম্বর দেওয়া ছিল। এসব ব্যানার একটি পণ্যের বস্তা দিয়ে তৈরি হয়েছিল। সে ধরনের প্লাস্টিকের বস্তা মনির হোসেনের রাঙামাটির বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ বলছে, মনির হোসেন আগে চট্টগ্রামের রাউজান এলাকায় থাকতেন। বর্তমানে তিনি রাঙামাটির কলেজ গেট এলাকায় বসবাস করছেন। তাঁর বিরুদ্ধে রাঙামাটির লংগদু ও চট্টগ্রামের রাউজান থানায় চুরি, মাদকসহ মোট চারটি মামলা আছে। চুরির একটি মামলায় তিনি ছয় মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন বলে পুলিশ জানায়।
রাউজান পৌরসভার সুলতানপুর ৫ নম্বর ওয়ার্ডের শীলপাড়ায় গত ২৩ ডিসেম্বর গভীর রাতে বাইরে থেকে দরজা আটকে একটি হিন্দু বাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। বাড়িটি কাতারপ্রবাসী সুখ শীল নামের এক ব্যক্তির। আগুনে পুড়ে যাওয়া বাড়ির কাছে হাতে লেখা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও প্রশাসনের ব্যক্তিদের দায়ী করে ব্যানার টানানো ছিল। এর আগে ২০ ডিসেম্বর ভোররাতে একইভাবে পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ঢেউয়াপাড়া এলাকায় বিমল তালুকদার ও রুবেল দাশ নামের দুই ব্যক্তির বসতঘরে এবং ১৯ ডিসেম্বর ভোরে কেউটিয়া ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাধন বড়ুয়ার বসতঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। আগুন লাগার বিষয়টি টের পেয়ে বাসিন্দারা ঘর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে বাইরে থেকে দরজা আটকানো থাকার বিষয়টি বুঝতে পারেন।
এ ঘটনার পর ২৬ ডিসেম্বর রাতে রাউজানের গহিরা বাজারে একটি কাপড়ের ভ্যানে আগুন দেওয়ার সময় কেরোসিনের বোতলসহ মো. মোরশেদুল আলম (৫৫) নামের একজনকে হাতেনাতে ধরা হয়। তখন তাঁকে বিভিন্ন বাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনার পেছনে মূল অভিযুক্ত হিসেবে শনাক্ত করেছিল পুলিশ। তবে পুলিশ এখন বলছে, মো. মোরশেদুল আলম নন, হিন্দু ও বৌদ্ধধর্মাবলম্বী মানুষের বাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনার মূল হোতা মনির হোসেন।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) মুহাম্মদ রাসেল প্রথম আলোকে বলেন, ‘গহিরায় কাপড়ের ভ্যানে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন মোরশেদুল আলম। তবে বাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাগুলোয় মনির হোসেন দায়ী। তাঁর দেওয়া তথ্যে তেমন ধারণাই করছি আমরা। তবে মোরশেদুলের সঙ্গে মনিরের কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা এখনো স্পস্ট নয়। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
এএসপি মুহাম্মদ রাসেল আরও বলেন, চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের যৌথ অভিযানে মনির হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে। গতকাল বিকেলে তাঁকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।