শহরে ঘুরে ঘুরে চা বিক্রিতেই আনন্দ আল-আমিনের
১৫ বছর বয়সে বাড়ি থেকে জীবিকার সন্ধানে বের হন আল-আমিন (২৫)। এরপর গত ১০ বছরে বিভিন্ন কাজ করেছেন। খারাপ ব্যবহারের কারণে কোনো কাজ ছেড়েছেন, আবার কোনোটা করতে গিয়ে ভালো লাগেনি। অবশেষে শহরে ঘুরে ঘুরে ফ্লাক্সে করে চা বিক্রির স্বাধীন পেশায় কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি খুঁজে পেয়েছেন তিনি।
সম্প্রতি আল-আমিনের সঙ্গে কুষ্টিয়া শহরের থানার মোড় এলাকায় কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তখন সকাল নয়টা। নীল রঙের পাঞ্জাবি পরা পরিপাটি পোশাকের এ তরুণ কাচঘেরা একটি দোকান থেকে বের হচ্ছিলেন। মুখে মৃদু হাসি। দুই হাতে বড় বড় দুটি ফ্লাস্ক। দোকানের চারজন কর্মচারীকে নিজ হাতে বানানো চা পান করিয়ে ছুটছিলেন অন্য সব দোকানে।
আল-আমিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘১০ মাস ধরে কুষ্টিয়া শহরে ঘুরে ঘুরে চা বিক্রি করি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তিন দফায় চা বিক্রি করে যা আয় হয়, তাই দিয়ে সংসার ভালোভাবেই চলে যায়।’ এ স্বাধীন পেশায় আনন্দ খুঁজে পান তিনি। বলেন, ‘পরের আন্ডারে কাজ করার থাইকা, নিজের আন্ডারে রিকশা চালানো ভালো।’
আল-আমিনের বাড়ি পাবনার সুজানগর উপজেলার সাতবাড়িয়া ইউনিয়নের শ্যামনগর গ্রামে। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে চতুর্থ আল-আমিন। বাবা মিন্টু শেখ রিকশাচালক। পরিবারে অভাব থাকার কারণে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করার পর বিদ্যালয় ছেড়ে দিতে হয়।
১০ বছর আগে বাসে চালকের সহকারীর কাজ করে পেশাজীবনের শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘এক মাস ওই কাজ (চালকের সহকারী) করে মন বসেনি। এরপর একটি রেস্তোরাঁয় দেড় মাস কাজ করি। মালিকে বকাবকি করত, তাই কাজ ছেড়ে গ্রামে ফিরে যাই। সুজানগর শহরে দেড় বছর সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাই। ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা হতো বলে বিরক্ত হয়ে ওই কাজও ছেড়ে দিই। এরপর এলাকায় কিছুদিন ব্যাটারিচালিত ভ্যান চালাই।’
একপর্যায়ে ২০১৯ সালে পরিচিত একজনের সঙ্গে যশোরে চলে যান আল-আমিন। সেখানে গিয়ে দুজন মিলে হেঁটে হেঁটে চা বিক্রির কাজ শুরু করেন। করোনাকালেও চা বিক্রি করেছেন। এতে বেশ ভালোই আয় হচ্ছিল তাঁদের। ২০২০ সালের মাঝামাঝি সময়ে কঠোর লকডাউন শুরু, আবার গ্রামে চলে যান। বাড়িতে ফিরেই পার্শ্ববর্তী গ্রামে বিয়ে করেন।
এরপর আবার কাজের সন্ধানে নামেন আল-আমিন। পদ্মা পার হয়ে কুষ্টিয়ায় চলে আসেন। এসেই শহরে হেঁটে হেঁটে চা বিক্রি হয় কি না, বোঝার চেষ্টা করেন। দেখেন, কুষ্টিয়া শহরে এভাবে ঘুরে ঘুরে কেউ চা বিক্রি করেন না। এতে আল-আমিনের মনে হয়, এটা শুরু করতে পারলে ভালো আয় করতে পারবেন। তিনি বলেন, কোনো কিছু করতে হলে আগে ভাবতে হবে। করার পর ভাবলে হবে না।
গত বছরের ডিসেম্বর মাস থেকে নাজমা খাতুন ও শিশুসন্তান আহমদ আলীকে নিয়ে কুষ্টিয়া শহরের পৌরবাজার এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকছেন আল-আমিন। এক কক্ষের ওই বাসার মাসিক ভাড়া দুই হাজার টাকা। তিনি বলেন, প্রতিদিন তিনবার চা নিয়ে বের হন। স্ত্রী আদাকুচি করে রাখেন। আসার সময় ফ্লাস্কের এক পাশে আদার পাত্র, আরেক পাশে ওয়ান টাইম কাপ বেঁধে দেন। চা বানিয়ে নিজেই ফ্লাস্কে ভরে নেন আল-আমিন। সকাল নয়টায় শহরের এনএস রোডে হাঁটতে থাকেন। সড়কের পাশের দোকান খোলার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর বিক্রি শুরু হয়।
কয়েক ঘণ্টা চা বিক্রির পর বেলা দুইটার দিকে ফিরে যান বাসায়। সেখানে এক ঘণ্টা থেকে আবার বেলা তিনটায় বের হন। সন্ধ্যা ছয়টায় বাসায় ফিরে আবার বের হন সাতটায়। এভাবে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার টাকার চা বিক্রি হয় আল-আমিনের।
খরচ বাদ দিয়ে গড়ে মাসে ১০ হাজার টাকা থাকে জানিয়ে এই তরুণ বলেন, এই টাকা দিয়েই সংসার ভালোই চলে যায়। মাঝেমধ্যে বাড়িতে যান। এ ছাড়া কখনো কখনো বাবা-মাকে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পাঠান। ছুটির দিন স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে ঘুরতে বের হন। ওই দিন চা বিক্রি করেন না।
নিজের জীবন-জীবিকার এসব গল্প বলার একপর্যায়ে সকাল সাড়ে নয়টা বেজে যায়। আল-আমিন বলেন, ‘এবার যাই। অন্য দোকানগুলো খুলে গেছে। চায়ের জন্য হয়তো কেউ কেউ অপেক্ষা করছেন।’