কী আছে ‘গোলামের পুরিতে’, যা খেতে এত ভিড়

খুলনার জনপ্রিয় ‘গোলামের পুরি’ দোকানের কর্ণধার শাহ আলম
ছবি: প্রথম আলো

খুলনার জনপ্রিয় একটি খাবার ‘গোলামের পুরি’। শেরেবাংলা রোডের ওজোপাডিকো শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কার্যালয় একতা ভবনের নিচতলার ছোট দোকানটিই গোলামের পুরির দোকান। পাওয়ার হাউস মোড়ের কাছের ওই দোকানে একটাই খাবার মেলে, সেটা হলো আলুপুরি।

গোলামের পুরি কিনতে বেশ খানিকটা সময় হাতে নিয়ে বের হতে হয়। ছোট ছোট পুরি পেতে বা খেতে বিকেলের পর থেকেই ছোট দোকানটির সামনে জটলা তৈরি হয়। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে কিনতে হয় খাবারটি। জনপ্রিয় এই আলুপুরির বিশেষত্ব হচ্ছে, এটি আকারে ছোট, বিশেষ মসলাযুক্ত আর কুড়মুড়ে। দাম একেকটা দুই টাকা। প্রতিদিন গড়ে এখানে ছয় হাজার পুরি বিক্রি হয়।

নগরের বয়রা এলাকা থেকে ডাকবাংলো এলাকায় কাজে এসেছিলেন শাহীনুল ইসলাম। বিকেলের পর শহরে এলে পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রায়ই গোলামের পুরি নিয়ে যান তিনি। লাইনে অপেক্ষারত অবস্থায় তিনি বলেন, ‘এই পুরি এখন খুলনার ঐতিহ্য হয়ে যাওয়ার পথে। অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি। দিয়ে তো পারে না। কেউ ১০টা, কেউ ৩০টা, কেউ  ১০০টা পর্যন্ত অর্ডার করছে। আকারে ছোট হলেও পুরিটা বেশ স্বাদের। পুরির সঙ্গে ছিটানো বিট লবণ, পেঁয়াজকুচি ও ধনেপাতা থাকে; যা স্বাদ আরও বাড়িয়ে দেয়।’

গোলামের পুরির খ্যাতি শহরজুড়ে। যার নামে দোকান, সেই গোলাম হোসেন বা তাঁর পরিবারের কেউ এটি চালান না। দোকানটির মালিক এখন গোলামের শাগরেদ মো. শাহ আলম সরদার। বাবু নামে তিনি বেশি পরিচিত।

সম্প্রতি এক রাতে ওই দোকানে গিয়ে দেখা গেল, দোকানের সামনে বেশ বড় লাইন। দোকানের নয়জন ভীষণ ব্যস্ত ক্রেতাদের সামলাতে। ৩৫ বর্গফুটের ওই ছোট দোকানের মধ্যে দুজন মেশিনের মতো হাত চালিয়ে পুরি বেলছেন। সামনের উনুনে গরম তেলে সেই পুরি ফেলছেন আরও দুজন। দোকানের পাশের আরেকটা বেঞ্চে আরও চারজন পুরি তৈরির কাজ করছেন। দোকানমালিক শাহ আলম সবকিছু তদারকি করছেন। মাঝেমধ্যে নিজেই পুরি তৈরি করছেন, আবার কখনো গ্রাহকের হাতে ভাজা পুরি তুলে দিচ্ছেন।

শাহ আলমের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, আশির দশকের শুরুর দিকে গোলাম হোসেন এই জায়গাতে পুরি বিক্রি শুরু করেন। গোলাম হোসেন ছিলেন পাকিস্তানের উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর মানুষ; যাঁদের বাংলাদেশে বিহারি বলা হয়, তাঁদের একজন। বছর সাত-আট দোকান চালানোর পর এরশাদ সরকারের শেষ সময়ের দিকে গোলাম হোসেন ছেলেদের নিয়ে পাকিস্তানে চলে যান। শিষ্য শাহ আলমকেও পাকিস্তানে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। মা রাজি না হওয়ায় তাঁর যাওয়া হয়নি। গোলাম হোসেন তাঁর শিষ্যকে দোকানটা চালু রাখার অনুরোধ করেন। সেই থেকে তিন দশকের বেশি সময় ধরে সুনামের সঙ্গে আলুপুরি বিক্রি করছেন শাহ আলম।  

আকারে ছোট পুরির সঙ্গে ছিটানো বিট লবণ, পেঁয়াজকুচি ও ধনেপাতা স্বাদ বাড়িয়ে দেয়
ছবি: প্রথম আলো

গোলামের আলুপুরিতে উপাদান হিসেবে আলু, ছোলার ডাল, রসুন, পেঁয়াজ, আদা, বিরিয়ানির মসলাসহ কয়েক ধরনের মসলা ব্যবহার করা হয়। মসলাই অন্য পুরি থেকে গোলামের পুরিকে আলাদা করে। শাহ আলম বলছিলেন, ‘এই পুরির দোকানে যখন আসি, তখন বয়স ৯ থেকে ১০ বছর হবে। আমি দোকানে কাজ করতাম, পাশাপাশি  ফুটবল খেলতাম। ওস্তাদের ছেলেও আমাদের দলে খেলত। এরপর সম্পর্কটা গাঢ় হয়। ওস্তাদ হঠাৎ চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আগে আমাকে মালামাল কেনার দোকানগুলো চিনিয়ে দেন। আর এই ইউনিয়ন অফিসের কর্তা ব্যক্তিদের হাতে আমাকে দিয়ে যান।’

গোলাম হোসেন প্রতিটি পুরি চার আনায় বিক্রি শুরু করেন। তিনি বাংলাদেশ ছাড়ার সময় প্রতিটি পুরির দাম ছিল আট আনা। ২০০০ সালের দিক থেকে দাম বেড়ে হয় এক টাকা। ২০০৮ সাল থেকে দুই টাকা করে বিক্রি হচ্ছে গোলামের পুরি। বিকেলে দোকান খোলা হয়, বন্ধ হয় রাত সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার দিকে।

বাগেরহাটের কচুয়া থেকে স্বাধীনতার আগে শাহ আলমের বাবা খুলনা শহরে আসেন। মুক্তিযুদ্ধের বছর চারেক পর শহরের ফেরিঘাট মোড়ে ভাঙ্গা মহল্লা বস্তি এলাকায় শাহ আলমের জন্ম। বাবা আলকাছ বাবুর্চি শহরের বেশ নামকরা বাবুর্চি ছিলেন। তবে বাবার কাজের মৌসুম থাকত মূলত বছরের ছয় মাস। বাকি ছয় মাস খুব কষ্টে কাটত। ছোটবেলায় এমনও দিন গেছে, ঘরে চুলা জ্বলেনি, না খেয়ে থাকতে হয়েছে তাঁদের।

শাহ আলমের কষ্টের জীবন শেষ হয়েছে। বটিয়াঘাটাতে নিজের জমিতে পাকা বাড়ি করেছেন। কম দামে জমিটুকু কিনেছিলেন। তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে থাকা কর্মচারী মাহাতাবকেও মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিয়েছেন। সব মিলিয়ে খুশি শাহ আলম বলেন, ‘আমি সবদিক দিয়ে খুশি। ব্যবসা-বাণিজ্য, ঘরসংসার আর মানুষের কাছ থেকে পাওয়া ইজ্জত; সব মিলিয়ে ভালো আছি। এখানে এমন এমন লোক আসেন, যা আমি কল্পনাও করতে পারি না। আমি খুলনার বাইরে অনেক জায়গা যাই; হয়তো আমি ওই লোককে চিনি না, কিন্তু লোকটা আমাকে চেনেন। অনেক সমাদর করেন। যখন বলেন, খুলনায় আপনার একটা ছোট দোকান আছে না? আমরা তো বেড়াতে গিয়ে সিরিয়াল দিয়ে পুরি খাইছি; তখন মনটা ভরে যায়।’