টিউশনি করে জমানো পাঁচ হাজার টাকা থেকে শুরু, এখন মাসে আয় তিন লাখ টাকা

রেনেসাঁর বাড়ি রাঙামাটি শহরের কেশন মহাজনপাড়া এলাকায়। ২০০৩ সালে বাবা অরুণ বিকাশ চাকমাকে হারান তিনি। এর পর থেকে শুরু হয় সংগ্রাম। মা ধন দেওয়ান একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় স্বল্প বেতনে চাকরি করতেন। এ কারণে সংসারে অনটন লেগেই ছিল। তবে এসব বাধা পেরিয়ে সফল হয়েছেন তিনি।

কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ করছেন রেনেসাঁ চাকমা। সম্প্রতি রাঙামাটি শহরের মহাজনপাড়া এলাকা থেকে তোলাছবি: তাঁর সৌজন্যে।

ছোট্ট কারখানায় কাজে ব্যস্ত কয়েকজন নারী। কেউ শুকনা আনারস প্যাকেট করছেন, কেউ ভেষজ উপাদান মিশিয়ে বানাচ্ছেন ফেসপ্যাক। মাঝখানে দাঁড়িয়ে এসব কাজের দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন রেনেসাঁ চাকমা (২৭)। তিনিই এ কারখানাটির মালিক। কয়েক বছর আগেও সংসারের খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হতো তাঁকে। এখন আর সেই দিন নেই। এখন তিনি মাসে আয় করেন প্রায় তিন লাখ টাকা।

রেনেসাঁর বাড়ি রাঙামাটি শহরের কেশন মহাজনপাড়া এলাকায়। ২০০৩ সালে বাবা অরুণ বিকাশ চাকমাকে হারান তিনি। এর পর থেকে শুরু হয় সংগ্রাম। মা ধন দেওয়ান একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় স্বল্প বেতনে চাকরি করতেন। এ কারণে সংসারে অনটন লেগেই ছিল। তবে এসব বাধা পেরিয়ে সফল হয়েছেন তিনি। পাশাপাশি প্রায় ১ হাজার ২০০ নারীকে সফল হওয়ার প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তিনি।

রেনেসাঁ রাঙামাটির মোনঘর আবাসিক উচ্চবিদ্যালয়ে দ্বিতীয় থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। পরে মোনঘরের সহায়তায় ঢাকায় একটি প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। এর পর থেকেই তাঁর মূল সংগ্রাম শুরু হয়। সংসার চালাতে শুরু করেন টিউশনি। রাঙামাটির কালিন্দিপুর, রাঙাপানি, কলেজগেট, বনরূপা, তবলছড়িসহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াতেন তিনি।

টিউশনি করাতে গিয়েও হেনস্তা হতে হয়েছে রেনেসাঁকে। তাঁর দাবি, একজন তরুণী প্রতিদিন ঘরের বাইরে গিয়ে উপার্জন করছেন, এমনটা অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। এসবের পরেও তিনি টিউশনি চালিয়ে গেছেন।

অদম্য নারী পুরস্কার হাতে রেনেসাঁ চাকমা। সম্প্রতি রাঙামাটি শহরের হ্যাপিড় মোড় থেকে তোলা
ছবি: তাঁর সৌজন্যে।

তবে রেনেসাঁর এ আয় স্থায়ী হয়নি। ২০২০ সালে করোনাভাইরাসের লকডাউনের সময় তাঁর সব টিউশনি বন্ধ হয়ে যায়। তখন তিনি রাঙামাটি সরকারি কলেজে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতকের শিক্ষার্থী ছিলেন।

রেনেসাঁ বলেন, ‘স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় টিউশনির বিকল্প চিন্তা থেকে “টুকিটাকি” নামে ছোট্ট দোকান দিয়েছিলাম। তখন পুঁজি ছিল মাত্র পাঁচ হাজার টাকা। ইউটিউব দেখে, গুগল ঘেঁটে এ দোকান এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। বারবার ভুল করেছি, আবার শুরু করেছি।’

টিউশনি করাতে গিয়েও হেনস্তা হতে হয়েছে রেনেসাঁকে। তাঁর দাবি, একজন তরুণী প্রতিদিন ঘরের বাইরে গিয়ে উপার্জন করছেন, এমনটা অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। এ কারণে পাড়ার কিছু বখাটে মাঝেমধ্যে তাঁকে নানা ধরনের হুমকি দিত। তবে এসবের পরও তিনি টিউশনি চালিয়ে গেছেন।

উদ্ভিদবিজ্ঞানের ছাত্রী হওয়ায় ভেষজ উপাদান নিয়ে আগ্রহ জন্মেছিল রেনেসাঁর মধ্যে। করোনার লকডাউনে নিমপাতা ও কাঁচা হলুদ দিয়ে বিভিন্ন রূপচর্চার পণ্য তৈরি করা শুরু করেন তিনি। এরপর আরও ভেষজ উপাদান যুক্ত করে ফেশিয়াল ক্লিনজার, তুলসী ফেশিয়াল ক্লিনজার, চারকোল ক্লিনজার, বিভিন্ন ফেসপ্যাক, হেয়ারপ্যাক ও হেয়ার অয়েল তৈরি করতে থাকেন। পাশাপাশি শুকনা আনারস, শুকনা পেঁপে, মিক্সড ড্রাই ফ্রুটস, আচার, কাজুবাদাম ও আনারসের লাড্ডুসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে অনলাইনে বিক্রি শুরু করেন।

কৃষিপণ্য নিয়ে কাজ করতে গিয়ে রেনেসাঁর পরিচয় হয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক উপপরিচালক তপন কুমার পালের সঙ্গে। তাঁর সহযোগিতায় বাণিজ্য সহজীকরণ ও নারী উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন রেনেসাঁ।

এরপর ২০২২ সালে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ বিষয়ে আরেকটি প্রশিক্ষণ নেন। সেখান থেকে নির্বাচিত হয়ে ২০২৩ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে থাইল্যান্ডে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ পান। দেশে ফিরে তিনি রাঙামাটি, বান্দরবান ও চট্টগ্রামের উইমেন চেম্বার অব কমার্সে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ব্র্যাকের প্রশিক্ষক হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন। গত তিন বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে সব মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ নারীকে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও হস্তনির্মিত পণ্য তৈরির প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তিনি।

প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি নিজের ব্যবসার কাজও এগিয়ে নেন রেনেসাঁ। ২০২২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি আবার জায়গা ভাড়া নিয়ে দোকানের কার্যক্রম শুরু করেন। সেবার তিনি ‘সাবাংগী নেটওয়ার্ক’ নামে একটি নারী উদ্যোক্তা গ্রুপের সহায়তা নেন। শুরুতে বাসা থেকেই সব পণ্য তৈরি করে এ দোকানে আনতেন। পরে গত বছরের ১ জানুয়ারি ছোট্ট একটি কারখানা স্থাপন করেন। বর্তমানে সেখানেই তাঁর পণ্য তৈরি হচ্ছে। কারখানার সরঞ্জাম কেনার জন্য তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে সহায়তা পেয়েছেন। সাবেক উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা এ বিষয়ে তাঁকে সাহায্য করেছেন।

‘স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় টিউশনির বিকল্প চিন্তা থেকে “টুকিটাকি” নামে ছোট্ট দোকান দিয়েছিলাম। তখন পুঁজি ছিল মাত্র পাঁচ হাজার টাকা। ইউটিউব দেখে, গুগল ঘেঁটে এ দোকান এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। বারবার ভুল করেছি, আবার শুরু করেছি।’
– রেনেসাঁ চাকমা, উদ্যোক্তা, রাঙামাটি
ঢাকা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সমবায় মাল্টিডিসিপ্লিনারি রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন এ কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ বিষয়ে প্রশিক্ষন দিচ্ছেন রেনেসাঁ চাকমা
ছবি রেনেসাঁর সৌজন্যে

রেনেসাঁ প্রথম আলোকে বলেন, ‘যখন দেখি আমার শেখানো পথে কোনো নারী নিজের ব্যবসা শুরু করেছেন, নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন, তখন মনে হয়, আমার কষ্টগুলো বৃথা যায়নি। বর্তমানে আমার প্রতিষ্ঠানে ছয়জন কাজ করছেন। সব মিলিয়ে এখন ১৫ লাখ টাকার পুঁজি রয়েছে।’

নারী উদ্যোক্তা হিসেবে কাজের স্বীকৃতিতে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি পুরস্কার পেয়েছেন রেনেসাঁ চাকমা। ২০২২ সালে ‘স্মার্ট নারী উদ্যোক্তা পুরস্কার’, গত বছর ‘আর্থসামাজিক উন্নয়নে নারী উদ্যোক্তা পুরস্কার’, চিটাগং চেম্বার অব কমার্সের ‘নারী উদ্যোক্তা পুরস্কার’ ও সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের আয়োজনে ‘অদম্য নারী পুরস্কার ২০২৫’ পেয়েছেন তিনি।

‘মেয়ে মাঝেমধ্যে ভেঙে পড়ত। আমি সব সময় তাকে বলতাম, তোমার পরিশ্রম একদিন ফল দেবে। এখন সে ফল পাচ্ছে। নিজের কাছেও বিষয়টি গর্বের।’
ধন দেওয়ান, রেনেসাঁ চাকমার মা

এত কিছুর পেছনে রেনেসাঁকে সব সময় উদ্বুদ্ধ করেছেন তাঁর মা ধন দেওয়ান। জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘মেয়ে মাঝেমধ্যে ভেঙে পড়ত। আমি সব সময় তাকে বলতাম, তোমার পরিশ্রম একদিন ফল দেবে। এখন সে ফল পাচ্ছে। নিজের কাছেও বিষয়টি গর্বের।’

রাঙামাটি মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক অনুকা খীসা প্রথম আলোকে বলেন, ‘রেনেসাঁ চাকমা একজন সফল নারী উদ্যোক্তা। আমরাও তাঁকে সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করি। তাঁকে দেখে অনেকেই উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তায় মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে। ভবিষ্যতেও কাজ করে যাবে।’