আয়োজকেরা জানান, আনন্দ-উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি হাফ ম্যারাথন আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য—পর্যটন জেলা মৌলভীবাজার এবং জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের সাহসিকতা তুলে ধরা। সেই লক্ষ্য থেকে এবার হাফ ম্যারাথনে মৌলভীবাজার জেলার মানচিত্রের মধ্যে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতিসৌধের ছবিসংবলিত টি–শার্ট ও মেডেল দেওয়া হয়েছে। স্মৃতিসৌধটি কমলগঞ্জ উপজেলার ধলই সীমান্তে অবস্থিত। তৈরি করা হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান তথ্যচিত্রও।

সকাল সোয়া ছয়টায় শহরের শ্রীমঙ্গল সড়কের বেঙ্গল কনভেনশন হল প্রাঙ্গণ থেকে ম্যারাথন শুরু হয়। ম্যারাথনের উদ্বোধন করেন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মিছবাহুর রহমান। এ সময় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. জিয়াউর রহমানসহ অন্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। উদ্বোধনের পরপরই নানা বয়সী নারী-পুরুষ দৌড় শুরু করেন।

দৌড়ের পথ ছিল শহরের শাহ মোস্তফা সড়ক, কোর্ট রোড, কালেঙ্গা সড়ক, দেওরাছড়া চা–বাগান হয়ে প্রেমনগর চা–বাগান পর্যন্ত। সকালে ছিল প্রচুর কুয়াশা। চা–বাগানের ভেতরে চাদরের মতো ঝুলছিল কুয়াশা। কুয়াশার মধ্যে দুই রকম দূরত্বে এ ম্যারাথন অনুষ্ঠিত হয়। একটি ১০ কিলোমিটার দূরত্বের। এ দূরত্বে অংশগ্রহণকারীরা শহরতলির কমলগঞ্জ উপজেলার কালেঙ্গা বাজারের দক্ষিণ প্রান্ত ছুঁয়ে মৌলভীবাজার স্টেডিয়ামে ফিরে আসেন।

ম্যারাথনের অন্যটির দূরত্ব ছিল ২১ দশমিক ১ কিলোমিটার। এ দূরত্বের অংশগ্রহণকারীরা প্রেমনগর চা–বাগান থেকে মৌলভীবাজার স্টেডিয়ামে ফেরেন। দৌড়ের পথটিতে এক কিলোমিটার পরপর ছিল পানি, কমলা ও খেজুরের ব্যবস্থা। ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ১২০ জন স্বেচ্ছাসেবক। ছিল অ্যাম্বুলেন্স এবং বিভিন্ন স্থানে পুলিশের উপস্থিতি। সাড়ে ৬০০ নিবন্ধনকারী এ ম্যারাথনে অংশ নেন। নিবন্ধনের বাইরেও ম্যারাথনে অনেক নারী-পুরুষ অংশ নেন।

এবারই প্রথম ম্যারাথনে অংশ নিয়ে কবি মুজাহিদ আহমদ বলেন, ‘এবার ১০ কিলোমিটার দৌড় সম্পন্ন করেছি। আগামীবার ২১ কিলোমিটারে অংশ নেব।’ ১০ কিলোমিটার ম্যারাথন সম্পন্ন করে উচ্ছ্বসিত ছিলেন কবি সুনীল শৈশবও।

১০ কিলোমিটার দূরত্বের দৌড় সম্পন্ন করেছে মৌলভীবাজার পৌর শরীরচর্চা অ্যাসোসিয়েশনের একটি দল। দলের অন্যতম সদস্য বিকাশ ভৌমিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে ২০ জন ম্যারাথনে অংশ নিয়েছিলাম। এটা আমাদের জন্য অনেক আনন্দের।’

বেঙ্গল কনভেনশন হল মৌলভীবাজার হাফ ম্যারাথনে ২১ কিলোমিটার দৌড়ে ছেলেদের মধ্যে প্রথম যশোরের আসিফ বিশ্বাস এবং মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়েছেন সিলেটের নাসরিন বেগম। ১০ কিলোমিটার দৌড়ে ছেলেদের মধ্যে প্রথম হয়েছেন মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার আশরাফুল আলম এবং মেয়েদের মধ্যে প্রথম সুনামগঞ্জের স্নেহা জান্নাত রাশেদা।

১০ কিলোমিটার দূরত্বে মেয়েদের মধ্যে প্রথম হওয়া স্নেহা জান্নাত রাশেদা ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। সে বলে, ‘প্রথম হয়ে অনেক ভালো লাগছে। এর আগে আরও তিনবার প্রথম হয়েছি।’

২১ কিলোমিটার দূরত্বে মেয়েদের মধ্যে প্রথম হওয়া নাসরিন বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ নিয়ে দেশ-বিদেশে ৩২ বার প্রথম হয়েছি। ৭ অক্টোবর দুবাই ফুজিরা ইনডোর ম্যারাথনে অংশ নিয়েছি। ছয় কিলোমিটার দৌড়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি।’ নাসরিন বেগম জানান, তাঁর বাবার বাড়ি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে। বৈবাহিক সূত্রে এখন তিনি সিলেটের বাসিন্দা।

মৌলভীবাজার সাইক্লিং কমিউনিটির ইমন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, বিদেশিসহ ৬৫০ জন ম্যারাথনে অংশ নিয়েছেন। দৌড়ের পথে প্লাস্টিকের ওয়ানটাইম গ্লাসসহ যেসব ময়লা-আবর্জনা আছে, ম্যারাথন শেষে স্বেচ্ছাসেবকেরা তা পরিষ্কার করে ফেলবেন।

সাইক্লিং কমিউনিটির সঞ্জীব মীতৈ বলেন, সামগ্রিকভাবে ম্যারাথন ভালো হয়েছে। কোভিডের পর বিষাদ, ক্লান্তি কাটানোর পাশাপাশি মৌলভীবাজারের পর্যটন তুলে ধরা, স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দৌড়ের উপকারিতা প্রচার ও জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস-ঐতিহ্য সবার সামনে উপস্থাপন করাই ছিল আয়োজনের অন্যতম দিক। এর সঙ্গে উৎসবের আনন্দ তো ছিলই।

সবশেষে স্টেডিয়ামে ছিল পুরস্কার বিতরণ। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জাকারিয়া, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাবরীনা রহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। ম্যারাথনে নিবন্ধিত সবাইকে টি-শার্ট ও মেডেল দেওয়া হয়েছে।