মহেশখালী চ্যানেল থেকে বালু তোলার অনুমতি ও দাম নিয়ে ‘বিতর্ক’
কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে বন্দরের একটি সড়ক নির্মাণের জন্য তোলা হবে ৬ কোটি ৩৫ লাখ ঘনফুট বালু। এ জন্য অনুমতিও দিয়েছে প্রশাসন। কিন্তু পরিবেশবাদীদের দাবি, এভাবে মহেশখালী চ্যানেল থেকে এভাবে বালু তোলা হলে ঝুঁকিতে পড়বে পরিবেশ। এ ছাড়া বালুর নির্ধারিত দাম নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
৭ এপ্রিল বালু তোলার অনুমোদন বাতিল চেয়ে জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে পরিবেশবিষয়ক তিনটি সংগঠন। সংগঠনের নেতাদের দাবি, প্রতিবেশ সংকটাপন্ন মহেশখালী চ্যানেল থেকে এভাবে বালু তোলা হলে কক্সবাজার বিমানবন্দরের চ্যানেলে সম্প্রসারিত ১ হাজার ৭০০ ফুটের রানওয়ে ঝুঁকিতে পড়বে। নদীভাঙন বাড়বে, সংকুচিত হবে জলপ্রবাহ, ধ্বংস হবে জীববৈচিত্র্য।
বাজারে প্রতি ঘনফুট বালুর দাম ১৬ টাকা। অথচ সড়ক নির্মাণের কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে একই বালু বিক্রি করা হচ্ছে মাত্র ২ টাকা ৩৭ পয়সায়। প্রায় সাত গুণ কম দরে এভাবে বালু বিক্রির অনুমতি দিয়েছে কক্সবাজার জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটি। ২ এপ্রিল এই অনুমোদন দেওয়া হয়। কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান।
কক্সবাজারের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘মাতারবাড়ী পোর্ট অ্যাকসেস রোড’ নির্মাণ করছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। বাংলাদেশ সরকার ও জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের জন্য গত বছরের ২৫ মার্চ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘টোকিও-ম্যাক্স ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড (এমআইএল) জেভি’র সঙ্গে চুক্তি হয়।
প্রথম ধাপে সাড়ে ১৬ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৭২৬ কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ২২৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। নির্মাণ ব্যয় নিয়ে আগে থেকেই প্রশ্ন ছিল। এবার মহেশখালী চ্যানেল থেকে বালু তোলার অনুমতি নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ ছাড়পত্র ও পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) সনদ না থাকার অভিযোগ উঠেছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এই সড়কের ভরাট কাজে ৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫৯ হাজার ১৮২ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে ‘টোকিও-ম্যাক্স ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড (এমআইএল) জেভি’কে। প্রতি ঘনফুট বালুর মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২ টাকা ৩৭ পয়সা।
তবে সওজ সূত্র বলছে, সাড়ে ১৬ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে মোট প্রয়োজন হবে প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট বালু। এর মধ্যে ৬ কোটির বেশি ঘনফুট বালু উত্তোলন করা হবে মহেশখালীর সোনাদিয়ার কাছে হামিদারদিয়া ও গোরকঘাটার ঠাকুরতলা সমুদ্র চ্যানেল থেকে। বাকি বালু উত্তোলনের পরিকল্পনা রয়েছে জেলার বিভিন্ন নদী, চর ও সাগর চ্যানেল থেকে।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, পুরো ২৭ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে প্রায় ৩৩ কোটি ঘনফুট বালু বা মাটির প্রয়োজন হবে। এই বিপুল পরিমাণ বালু উপকূল, নদী ও চ্যানেল থেকে উত্তোলন করলে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের পরিচালক মো. জমির উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া মহেশখালীর সাগর চ্যানেল থেকে বালু উত্তোলনের সুযোগ নেই। মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ইআইএ করা হলেও সেখানে কোন জায়গা থেকে কী পরিমাণ বালু উত্তোলন করা হবে, তার উল্লেখ নেই। মহেশখালী চ্যানেল কিংবা জেলার যে কোনো খাল নদী ড্রেজিং করে বালু উত্তোলন করতে গেলে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও ইআইএ বাধ্যতামূলক। এখন পর্যন্ত কেউ আবেদন করেনি। অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হলে পরিবেশ অধিদপ্তর আইনি ব্যবস্থা নেবে।
পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ৬ কোটি ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক ও জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মো. আ. মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত মতে শর্ত সাপেক্ষে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। মাতারবাড়ী বন্দর প্রকল্পের জন্য আগেই পরিবেশ অধিদপ্তরের ইআইএ করা আছে।
মহেশখালী চ্যানেল থেকে বালু উত্তোলনের জন্য নতুন করে ইআইএ অথবা ছাড়পত্রের প্রয়োজন হবে না। নির্দিষ্ট জায়গা ছাড়া অন্য কোনো জায়গা থেকে বালু উত্তোলন এবং নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি বালু উত্তোলন হচ্ছে কি না, তা তদারকির ব্যবস্থা থাকবে।
বালুর দাম নিয়ে প্রশ্ন
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, গত ৩ মার্চ বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় সওজ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলীরা প্রতি ঘনফুট বালুর দাম যথাক্রমে ১৬ দশমিক ৭০, ১৬ দশমিক ৭৯ ও ১৬ দশমিক ৮০ টাকা প্রস্তাব করেন। কিন্তু পরে তা কমিয়ে ৬ দশমিক ৯৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
পরে ঠিকাদার নিজ খরচে বালু উত্তোলন করবেন, এই যুক্তিতে কার্যত মূল্য কমে দাঁড়ায় ২ টাকা ৩৭ পয়সায়। এ হিসাবে ৬ কোটি ৩৪ লাখ ঘনফুট বালুর জন্য মোট মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১৫ কোটি ৬ লাখ টাকা। এর সঙ্গে ভ্যাট ও আয়কর বাবদ অতিরিক্ত অর্থ সরকারকে জমা দিতে হবে।
বালু উত্তোলনের জন্য ঠিকাদার এক বছর সময় পাবে উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে প্রতি ঘনফুট বালুর মূল্য ৬ দশমিক ৯৪ টাকা ধরা হয়। ওই পরিমাণ বালু দুই জায়গায় মজুত আছে। ঠিকাদার নিজের খরচে ড্রেজিং ও বালু উত্তোলন করবে, তাই ওই খরচ বাদ দিয়ে ২ দশমিক ৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি পাওনা-ভ্যাট জমা দেওয়ার পর ঠিকাদারকে বালু উত্তোলনের কার্যাদেশ দেওয়া হবে।
তবে শহরের বালু ব্যবসায়ী ও ঠিকাদার দিব্যেন্দু পাল বলেন, নদী-খাল থেকে তোলা ঘনফুট বালু ৮ থেকে ১৬ টাকায় বিক্রি হয়।
প্রকল্প পরিচালক ও সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আকবর হোসেন পাটোয়ারীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে গত ১১ জানুয়ারি পাঠানো এক চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, প্রকল্পের সংশোধিত ডিপিপিতে বালু বা মাটি ভরাটের জন্য আলাদা কোনো অর্থ বরাদ্দ নেই। চুক্তি অনুযায়ী ঠিকাদারই বালু সংগ্রহসহ সব ব্যয় বহন করবেন।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমআইএল কক্সবাজারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইফতিয়ার আলম বলেন, বালু উত্তোলনের জন্য লিখিত অনুমতিপত্র হাতে আসেনি। নিয়ম মেনে বালু উত্তোলন করা হবে।
আগেও কম দামে বালু বিক্রির চেষ্টা
এর আগে ২০২৫ সালের ১৩ আগস্ট বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) একই পরিমাণ বালু উত্তোলনের অনুমতি দেয়। তখন প্রতি ঘনফুট বালুর দাম দাঁড়িয়েছিল মাত্র ৪৪ পয়সা (ভ্যাট-কর বাদে)।
এ ঘটনায় দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে এবং দুদক তদন্ত শুরু করে। দুদক থেকে জেলা প্রশাসককে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়, নামমাত্র মূল্যে বালু বিক্রি করে রাষ্ট্রের শতকোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি করা হয়েছে।
পরে বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে জেলা প্রশাসক ভূমি মন্ত্রণালয়ের কাছে নির্দেশনা চান। জাতীয় বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় ওই কার্যাদেশ বাতিল করা হয়।
পরিবেশ ঝুঁকির শঙ্কা
৭ এপ্রিল জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দিয়ে বালু উত্তোলনের অনুমতি বাতিলের দাবি জানিয়েছে তিনটি সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস), কক্সবাজার সিভিল সোসাইটি ও নদী পরিব্রাজক দল। স্মারকলিপিতে বলা হয়, মহেশখালী চ্যানেল থেকে ৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫৯ হাজার ১৮২ ঘনফুট বালু উত্তোলন করা হলে হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে বিলীনের ঝুঁকিতে পড়বে। বিমানবন্দর থেকে সাগর চ্যানেলের দিকে ১ হাজার ৭০০ ফুটের ওই রানওয়ে সম্প্রসারণ করা হয়। ৬ কোটি ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমতি নিয়ে ঠিকাদার ৫০ কোটি ঘনফুট বালু উত্তোলন করলে ধরার কেউ নেই।
ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) চেয়ারম্যান মুজিবুল হক বলেন, ‘পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া মহেশখালীর সংকটাপন্ন সোনাদিয়া ও গোরকঘাটা চরাঞ্চল ও সাগর চ্যানেল থেকে কোটি কোটি ঘনফুট বালু-মাটি উত্তোলন করা হলে নদীর গতিপথ সংকুচিত হয়ে পড়বে, নৌযান চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি ঝড়–জলোচ্ছ্বাসে উপকূল বিলীন, প্যারাবন উজাড়, জীববৈচিত্র্য ধ্বংসসহ প্রাকৃতিক ভারসাম্য হারিয়ে যেতে পারে। আমরা বালু উত্তোলনের অনুমোদন বাতিল চাই।’
বেলার নোটিশ
এদিকে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) ও পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই কক্সবাজারের মহেশখালী চ্যানেল ও উপকূল থেকে বিপুল পরিমাণ বালু তোলার অনুমতি দেওয়ার ঘটনায় ২ সচিবসহ ১১ জনকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)।
গতকাল বুধবার বিকেলে ডাকযোগে এই নোটিশ পাঠানো হয় বলে জানিয়েছেন বেলার আইনজীবী জাকিয়া সুলতানা। নোটিশে মহেশখালী চ্যানেল থেকে বালু উত্তোলনসহ নদীবিরোধী সব কার্যক্রম বন্ধ এবং সংশ্লিষ্ট অনুমতি বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে।
নোটিশে বলা হয়েছে, এ বিষয়ে গৃহীত পদক্ষেপ সাত দিনের মধ্যে বেলার আইনজীবীকে জানাতে হবে। অন্যথায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নোটিশ পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও বেলার প্রতিনিধি এস হাসানুল বান্না।
যাঁদের কাছে নোটিশ পাঠানো হয়েছে, তাঁরা হলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)–এর চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার, পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের পরিচালক, মাতারবাড়ী পোর্ট এক্সেস রোড নির্মাণ প্রকল্পের (সওজ অংশ) প্রকল্প পরিচালক এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টোকিও–এমআইএল (জেভি)–এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
নোটিশে উল্লেখ করা হয়, কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলায় মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের (সওজ অংশ) আওতায় পোর্ট এক্সেস সড়ক নির্মাণের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টোকিও–এমআইএল (জেভি)–কে মহেশখালী চ্যানেল এবং উপকূলের হামিদারদিয়া ও ঠাকুরতলা মৌজা থেকে ৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫৯ হাজার ১৮২ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ২ এপ্রিল জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটি কিছু শর্ত সাপেক্ষে এ অনুমোদন দেয়।
বেলার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, স্থানীয় জনমত উপেক্ষা করে এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ছাড়াই এভাবে বালু উত্তোলন করা হলে নদীভাঙন বৃদ্ধি পাবে, জলপ্রবাহ ব্যাহত হবে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হবে। এতে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে পরিবেশ-প্রতিবেশ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।