আমাদের আরেকটি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে হবে: নাহিদ ইসলাম
দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম সামনে আরেকটি লড়াইয়ের জন্য সবাইকে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এ ছাড়া বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয়করণের অভিযোগ তুলেছেন তিনি। বুধবার এনসিপির সিলেট জেলা ও মহানগরের আয়োজনে বিভাগীয় ইফতার অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এনসিপি আহ্বায়ক এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেন।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তনসহ রাষ্ট্রীয় কিছু প্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিস্থিতি আপনারা দেখেছেন, বাসসের পরিস্থিতি আপনারা দেখেছেন এবং সর্বশেষ আমরা দুদকের (দুর্নীতি দমন কমিশন) পরিস্থিতি দেখলাম। দুদক একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনোই দুদক স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে নাই।’
বিএনপির বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পূর্বের কথা স্মরণ করিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘বিএনপির মহাসচিব একসময় বলেছিলেন, এই দুদক হচ্ছে বিরোধী দল দমন কমিশন। এই আমলেও সেই জিনিসটাই থাকবে কি না, এই প্রশ্ন উঠছে। দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনাররা কেন পদত্যাগ করলেন?
সরকারের কোনো চাপে পদত্যাগ করেছেন কি না, তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে সংসদে এবং জনগণের পক্ষ থেকে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। দুদকের পরবর্তী চেয়ারম্যান কীভাবে নিয়োগ হবে, দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ হবে, নাকি বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করে নিয়োগ দেওয়া হবে, সে প্রশ্নও আমরা রেখে যাচ্ছি।’
আরেকটি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমাদের আরেকটি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে হবে, এবার আমরা ভুল করতে চাই না। এবার আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েই মাঠে নামতে চাই। গণ–অভ্যুত্থান হয়তো হয়ে গিয়েছিল। সেই অভ্যুত্থান–পরবর্তী করণীয় ক্ষেত্রে হয়তো আমরা অনেক কিছুই ভুল করেছি। ফলে আজকে দেশের অবস্থা আরও বেহাল হয়েছে। দেশ আবারও গণতন্ত্র থেকে একদলীয় স্বৈরতন্ত্রের দিকে যাবে কি না, সে প্রশ্ন উঠেছে।’
নাহিদ ইসলাম তাঁর বক্তব্যে সিলেটের দলীয় নেতা–কর্মীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি ঐক্যবদ্ধ থাকার তাগিদ দিয়ে সামনে যে নির্দেশনা আসবে, সেই নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করার আহ্বান জানান।
এনসিপির সিলেট জেলার আহ্বায়ক জুনেদ আহমদের সভাপতিত্বে ও মহানগরের আহ্বায়ক আবদুর রহমানের (আফজার) সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। স্বাগত বক্তব্য দেন এনসিপি সিলেট মহানগরের সদস্যসচিব কিবরিয়া সরওয়ার।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদির কথা স্মরণ করে বলেন, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য ওসমান হাদিকে দিনদুপুরে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। সরকারের কাছে হাদি হত্যার বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে সামনে এগোনোর আহ্বান তিনি।
প্রশাসনে আগের মতোই দলীয়করণ করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকে একজন সোয়েটার ব্যবসায়ীকে বাসানো হয়েছে। যাঁরা দুর্নীতি করে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড বা নেপালে পালাইয়া ছিল, তাঁরা এখন দেশের ভেতরে ঢুকছে। আমরা নতুন বাংলাদেশে তাঁদের চাই না। আপনাদের সংশোধনের সুযোগ দিচ্ছি; যদি হেদায়েতের পথে না আসেন, তবে তরুণদের ভয়ংকর পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে।’
নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে উল্লেখ করে নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘আমরা সরকারকে অনুরোধ জানাব, বাংলাদেশে ধর্ষণ বন্ধ করার উদ্যোগ নিন। বাংলাদেশের মা-বোনদের নিরাপত্তা দিন। নতুন বাংলাদেশে আমরা সুন্দর পরিবেশ চাই, যেখানে জামায়াত, বিএনপি সবাই মিলেমিশে থাকব।’
বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বেশ কিছু উদ্যোগের প্রশংসা করলেও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ চেষ্টার তীব্র প্রতিবাদ জানান বিশেষ অতিথি এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। বাংলাদেশ ব্যাংক, দুদক বা পিএসসিতে দলীয় লোক বসিয়ে আয়ত্তে রাখার সুযোগ দেওয়া হবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন। সারজিস আলম বলেন, ‘শেখ হাসিনার আমলে অফিসের দলীয় লোক মানুষকে তটস্থ করে রাখত। আমরা আর সেই বাংলাদেশ দেখতে চাই না। যাঁরা ফ্যাসিবাদের প্রমাণিত দোসর বা জুলাই বিপ্লবের বিরোধী ছিল, তাঁদের যদি আপনারা প্রশ্রয় দেন, তবে সেই ফাঁদে আপনাদেরই শেষ হতে হবে।’
ইফতার–পূর্ববর্তী সভায় বক্তব্য দেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী, জামায়াতের সিলেট মহানগরের আমির ফখরুল ইসলাম, জাতীয় যুব শক্তির আহ্বায়ক তারেকুল ইসলাম প্রমুখ।