মেয়ের স্কুলব্যাগ, বই–খাতা আর ফ্রক বুকে জড়িয়ে কাঁদছেন মা–বাবা

হত্যাকাণ্ডের শিকার শিশুর বইখাতা। সেই স্মৃতি আঁকড়ে কাদছেন মা–বাবা। বুধবার সকালে লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলায় শিশুটির বাড়িতেছবি: প্রথম আলো

শোবার ঘরের খাটের ওপর ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে মেয়েটির স্কুলব্যাগ ও ফ্রক। পাশেই প্রথম শ্রেণির বই–খাতা। মেয়েকে হারিয়ে এখন তার স্মৃতিচিহ্ন আঁকড়ে ধরে কাঁদছেন মা–বাবা। কে তাঁদের মা–বাবা বলে ডাকবে, সেই কথা ভেবে আহাজারি করছেন। তাঁদের একটাই দাবি, মেয়েকে হত্যা ও নির্যাতনকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে শিশুটির মা প্রথম আলোকে বলেন, ‘মেয়েটিকে নেশাখোর বিধান চন্দ্র ফুসলিয়ে নিয়ে এভাবে মারি ফেলে ভুট্টাখেতত বস্তাত ভরি পুঁতি থুইল। ও তো আর কোনো দিন মোক মা কয়া ডাক দিবার নয়; ওর বাপোক বাবা কয়া ডাক দিবার নয়। আমরা থানাত মামলা দিছি। বিধানসহ ওগুলোর ফাঁসি চাই, তাইলে মনোত শান্তি হবে।’

গতকাল মঙ্গলবার সকালে লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার একটি ভুট্টাখেত থেকে সাত বছর বয়সী এক শিশুর বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। শিশুটি স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে পড়ত। স্বজনদের অভিযোগ, শিশুটিকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যার পর লাশ বস্তায় ভরে ভুট্টাখেতে পুঁতে রাখা হয়েছিল। আগের দিন সোমবার বিকেল থেকে শিশুটি নিখোঁজ ছিল।

এ ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে প্রতিবেশী বিধান চন্দ্র বর্মণ (২০) ও তাঁর বাবা রণজিৎ চন্দ্র বর্মণকে গতকাল আটক করে পুলিশ। কিন্তু স্থানীয় জনতা মব সৃষ্টি করে তাঁদের নিজেদের হাতে তুলে নিতে চান। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের লোকজনের ওপর দফায় দফায় হামলা হয়। ভাঙচুর করা হয় সরকারি ছয়টি গাড়ি। পুড়িয়ে দেওয়া হয় আটক ব্যক্তিদের বাড়ি। আহত হন পুলিশ সদস্যসহ ৩০ থেকে ৩৫ জন। পরে শিশুটির বাবার করা মামলায় আটক দুজনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।

আরও পড়ুন

আজ বুধবার দুপুরে শিশুটির গ্রামের বাজারে গিয়ে অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ দেখা যায়। গ্রামের তরুণ ও যুবক বয়সী তেমন কাউকে বাজারে দেখা যায়নি। শিশুটির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শিশুটির মা–বাবা মেয়ের বই-খাতা, পোশাক নিয়ে আহাজারি করছেন এবং মেয়ের হত্যার বিচার দাবি করছেন।

প্রশাসনের সঙ্গে গতকাল মঙ্গলবারের হামলার ঘটনার পর এলাকার বাজারের অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ। বুধবার দুপুরে
ছবি: প্রথম আলো

স্থানীয় বাসিন্দা জলধর বর্মণসহ প্রবীণ কয়েকজন ব্যক্তি বলেন, তাঁদের জীবনকালে এমন ভয়াবহ ঘটনা তাঁদের গ্রামে কখনো ঘটেনি। তাঁদের দাবি, আসামিকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ প্রশাসনের গাড়িতে হামলায় গ্রামের কেউ জড়িত ছিলেন না। তাঁদের অধিকাংশই বহিরাগত ও অচেনা। হামলার ঘটনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মামলা করার কথা তাঁরা শুনেছেন। গণহারে যেন আসামি না করা হয়, সেই দাবি করেন তাঁরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার দিন (সোমবার) রাত ১২টার দিকে শিশুটির বাবা গ্রামের কয়েকজনকে নিয়ে থানায় গিয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ অভিযোগ না নিয়ে আরও খোঁজখবর নিয়ে কয়েক দিন পর থানায় যেতে বলেন। পরদিন (মঙ্গলবার) লাশ উদ্ধারের পর দুপুরে পুলিশ বিধান চন্দ্র ও তাঁর বাবাকে আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়ার সময় কে বা কারা হট্টগোল করে একপর্যায়ে মব সৃষ্টি করেন।

ওই ঘটনায় কর্তব্যে অবহেলার জন্য আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাজমুল হককে গতকাল থানা থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়। লালমনিরহাট সদর হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত সম্পন্নের পর গতকাল রাত সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশের তত্ত্বাবধানে শিশুটির লাশ গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর রাত দুইটা পর্যন্ত গ্রামের শ্মশানে চলে সৎকারের কাজ। আজ দুপুরে অভিযুক্ত বিধান চন্দ্র রায় ও তাঁর বাবা রণজিৎ চন্দ্র রায়কে মেয়েটির বাবার করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করে আদিতমারী থানা-পুলিশ।

আরও পড়ুন

লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, শিশুটির বাবা একটি হত্যা মামলা করেছেন। তিন আসামির মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করে আজ দুপুরে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। এ ঘটনা তদন্তের পাশাপাশি পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।