বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে (১৫ নভেম্বর থেকে ১৫ এপ্রিল) ৯ উপজেলায় ৬৬ হাজার ২৯১ একর জমিতে ২৩ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত ২ মাসে জেলায় লবণ উৎপাদিত হয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার মেট্রিক টন। নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে ৫০ শতাংশ জমিতে লবণ উৎপাদিত হলেও ১০ জানুয়ারি থেকে শতভাগ জমিতে লবণ উৎপাদন শুরু হয়েছে।

বিসিকের লবণশিল্প উন্নয়ন প্রকল্পের মাঠ পরিদর্শক মো. ইদ্রিস আলী প্রথম আলোকে বলেন, লক্ষ্যমাত্রার শতভাগ জমিতে এখন পলিথিন প্রযুক্তিতে সাদা লবণ চাষ হচ্ছে। ৬৬ হাজার একর জমিতে দৈনিক ১০ হাজার মেট্রিক টনের বেশি লবণ উৎপাদিত হচ্ছে। রামু, ঈদগাঁও ও সদর উপজেলায় প্রতি মণ লবণ বিক্রি হচ্ছে ৪৭৫ টাকায়। আর টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়ায় প্রতি মণে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেশি পাওয়া যাচ্ছে। প্রতি মণ লবণের দাম ৪৭৫ টাকা হলেও ১০ হাজার মেট্রিক টন লবণের দাম পড়ে (প্রতি টন ১১ হাজার ৮৭৫ টাকা) ১১৮ কোটি ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের উত্তরপাড়াসহ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অন্তত দেড় হাজার একর জমিতে লবণ উৎপাদন চলছে। মাঠজুড়ে লবণের স্তূপ। ট্রাক বোঝাই করে সেই লবণ বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে।

উত্তরপাড়ার চাষি হামজালাল বলেন, ১২ নভেম্বর থেকে তিনি ৭ কানি (৪০ শতকে ১ কানি) জমিতে লবণ চাষ শুরু করেন। ইতিমধ্যে ২৭৫ মণ লবণ বিক্রি করেছেন। ডিসেম্বর মাসে প্রতি মণ লবণ বিক্রি করেছেন সর্বোচ্চ ৫২০ টাকায়। এখন দাম কিছুটা কমে ৪৭৫ থেকে ৪৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি মণ লবণ উৎপাদনের বিপরীতে খরচ হচ্ছে ২১০ টাকার মতো। ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত মাঠে আরও ৩০০ মণ লবণ উৎপাদনের আশা করছেন তিনি।

সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান নুর হোসেন বলেন, তাঁর ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ, কাঁটাবাড়িয়া, আছারবুনিয়াসহ বিভিন্ন এলাকার অন্তত আড়াই হাজার একর জমিতে লবণ চাষ হচ্ছে। এবার ভালো দাম পাওয়া অনেকে লবণ চাষে উৎসাহিত হচ্ছে।

কুতুবদিয়ার বড়ঘোপ ইউনিয়নের তিন হাজার একর জমিতে লবণ চাষ হচ্ছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সমুদ্রের লোনাপানি মাঠে জমিয়ে রোদে শুকিয়ে লবণ উৎপাদন করেন হাজারো চাষি।

সেখানকার চাষি জয়নাল আবেদীন বলেন, গতবার তিনি প্রতি মণ লবণ সর্বোচ্চ ২১৫ টাকায় বিক্রি করেছেন। এখন বিক্রি হচ্ছে ৪৮৫ থেকে ৪৯০ টাকায়। ২০ বছরের মধ্যে এবার ৩০০ টাকার বেশি দামে লবণ বিক্রি হচ্ছে। বিদেশ থেকে লবণের আমদানি বন্ধ থাকায় প্রান্তিক চাষিরা লাভবান হচ্ছেন। বড়ঘোপ ইউপির চেয়ারম্যান আবুল কালাম বলেন, মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় লবণ উৎপাদনে উৎসাহিত হচ্ছেন চাষিরা।

মহেশখালীর লবণচাষি ও কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিক বলেন, মাঠে উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে লবণ আমদানি বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি চাষিদের সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে লবণ চাষে উৎসাহ দিচ্ছে সরকার। এ জন্য উৎপাদন ও চাষের জমি—দুটোই বেড়েছে।

প্রায় ৪০ হাজার প্রান্তিক চাষি, ১ লাখ শ্রমিকসহ জেলার অন্তত ১০ লাখ মানুষ লবণ উৎপাদন, পরিবহন ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। বিসিকের তথ্যমতে, গত মৌসুমে ৬৩ হাজার ২৯১ একর জমিতে লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ২৩ লাখ ৫৭ হাজার মেট্রিক টন। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। গতবার লবণ উৎপাদিত হয়েছিল ১৮ লাখ ৩১ হাজার ৯৩১ মেট্রিক টন।

বিসিকের কক্সবাজার লবণশিল্প উন্নয়ন প্রকল্পের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া বলেন, এবার তিন হাজার একর জমিতে চাষ বাড়ায় লবণের উৎপাদনও বাড়বে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার মৌসুম শুরুর ১৫ দিন আগেই চাষিরা মাঠে নেমেছেন। ন্যায্যমূল্য পাওয়ায় তাঁরা লবণ উৎপাদনে উৎসাহিত হচ্ছেন। শতভাগ জমিতে আধুনিক পলিথিন প্রযুক্তিতে লবণ উৎপাদিত হচ্ছে। সনাতন পদ্ধতির তুলনায় পলিথিন পদ্ধতিতে আড়াই গুণ বেশি লবণ উৎপাদিত হয়। এ ছাড়া পলিথিন পদ্ধতির লবণের গুণমানও ভালো। এ জন্য দামও বেশি পাচ্ছেন চাষিরা।