‘আমি বুঝতে পারতেছি না, এটা রাতের সরকার কি না’, বিএনপির উদ্দেশে জামায়াতের আমির
বিএনপি সরকারও অতীতের সরকারের মতো ‘রাতের সরকার কি না’—এমন প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসী কায়দায় ব্যর্থ, পলাতক, পরিত্যক্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ডেপুটি গভর্নরকে এখানে বসিয়েছেন, ওকে সরান। এমডিকে জোর করে ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে তাঁর পদত্যাগ নিয়ে রাতের অন্ধকারে মিটিং করে কবুল করেছেন।’
এরপর শফিকুর রহমান বলেন, ‘আসলে আমি বুঝতে পারতেছি না, এটা (বিএনপি) রাতের সরকার কি না। গত পরশু দিন তেলের দাম বাড়াইছে মধ্যরাতে, মানুষ যখন ঘুমাই পড়ছে, তখন। এখন দেখি, বোর্ড মিটিং করে সবচেয়ে বড় ব্যাংকের, এটাও দেখি রাতের বেলা। এরা কি দিনের আলোকে ভয় পায়?’
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সিলেট নগরের পূর্ব শাহি ঈদগাহ এলাকার জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে জামায়াতে ইসলামী সিলেট মহানগর শাখার উদ্যোগে আয়োজিত এক সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শফিকুর রহমান এ কথা বলেন। এ সময় তিনি জামায়াতের নেতাদের ‘গুপ্ত’ বলার সমালোচনা করেন।
জামায়াতের আমির বলেন, ‘এখন আমাদের দেখবেন গুপ্ত বলা হয়। তাই না? তো আমি বলেছিলাম, গুপ্ত তো অবশ্যই। দেশের ভেতরে গুপ্ত ছিলাম। বাইরে যাইনি। গুপ্ত তো অবশ্যই। তিন বৎসরের মতো জেলে ছিলাম, ওইটা তো গুপ্তই। ওই রকম গুপ্ত থেকে থেকেই তো লড়াই করে এই দেশটা মুক্ত হয়েছে। আমরা ইনশা আল্লাহ এই দেশেই থাকব। এই দেশে থাকার নাম যদি গুপ্ত হয়, তাহলে অবশ্যই আমি গর্বিত গুপ্ত। দেশ ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার নাম যদি বীরত্ব হয়ে থাকে, তাহলে ওই বীরত্বকে ঘৃণা করি। রাজনীতি করতে হলে দেশের মানুষকে ধারণ করতে হবে। সুদিনে যেমন থাকব, ইনশা আল্লাহ দুর্দিনেও থাকব। দেশ ছেড়ে পালব না।’
সুধী সমাবেশে জামায়াতের আমির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হলেও গণনা ও ফলাফল সঠিক হয়নি বলে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘ভোট সুষ্ঠু হয়েছে। গণনা এবং রেজাল্ট—দুটা দুষ্টু হয়েছে। অনেকেই এখন সত্য কথাটা বিভিন্ন কায়দায় বলে ফেলছেন। সত্য চাপা পড়ে না। একসময় বের হয়ে আসে। আমাদের লোকে আফসোস করে নির্বাচনের পরপর বলতেন, “আমরা এত ভোট দিলাম, আপনারা ভোটগুলা ঘরে উঠাইতে পারলেন না।” ট্রু। জনগণ তো দিয়েছে আমাদের। এর প্রমাণ হচ্ছে গণভোটের রায়।’
গণভোটের রায়কে সম্মান দিয়ে বিএনপির শপথ না নেওয়ার সমালোচনা করে জামায়াতের আমির বলেন, ‘আপনারা দেশের ৭০ ভাগ মানুষের রায়কে অগ্রাহ্য করার মাধ্যমে দুইটা জিনিসকে অপমান করেছেন। একটা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে অপমান করেছেন। আরেকটা জনগণকে অপমান করেছেন। মনে রাখবেন, অপমানের প্রতিশোধ জনগণ নিয়েই ছাড়ে। কাউকে ছাড় দিয়ে কথা বলে না। আমরা ছাড়ব না। সংসদের ভেতরে দুই-তৃতীয়াংশের উনাদের যে শক্তি আছে, সেই শক্তির বলে এটাকে ধামাচাপা দিয়েছেন; কিন্তু এটা ছাইচাপা আগুন হয়ে একসময় আগ্নেয়গিরির রূপ নেবে, ইনশা আল্লাহ।’
বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নর নিয়োগের সমালোচনা
সুধী সমাবেশে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের সমালোচনা করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো সেনসেটিভ জায়গা, যেটাকে অর্থনীতির হার্ট বলা হয়ে থাকে। সেই জায়গায় একজন লোককে গভর্নর হিসেবে বসানো হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে না, বিশ্বের ইতিহাসে এ ধরনের কোনো দুর্বল ব্যক্তিকে সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নর করা হয়েছে, এর কোনো ইতিহাস নাই, নজির নাই। নিজে একজন ঋণখেলাপি। তিন মাস আগে তিনি ঋণখেলাপির দায় থেকে মুক্তি পেয়েছেন।’
এরপর জামায়াতের আমির অভিযোগ করেন ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, জেলা পরিষদের প্রশাসক, তার পরে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিভিন্ন জায়গায় এখন এমন সব লোককে বসানো হচ্ছে, আসলে যাঁদের বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম-অপকর্মে দেশের আগে ১১টা পর্যন্ত বাজছিল, এখন সাড়ে ১২টা বাজাইছে।’
সংসদে আলোচনা করে কার্ড দেওয়ার দাবি
শফিকুর রহমান বলেন, ‘চাঁদাবাজদের চাঁদাবাজি বন্ধ হয়ে যাক। জিনিসপত্রের দাম তিন ভাগের এক ভাগ অটোমেটিক্যালি বন্ধ হয়ে যাবে। ভাই, আপনার কার্ডের তো তখন প্রয়োজন হবে না। আপনি কার্ড দেবেন ২ হাজার টাকার; আর এই মানুষের পকেট কাটা হবে ২০ হাজার টাকার। তাহলে এই মানুষ বাঁচবে কীভাবে? আর কার্ড যদি দিতে হয়, তাহলে সংসদে আলোচনা করে দেন। কেউ তো নিজের পকেটের টাকা দিচ্ছেন না। জনগণের ট্যাক্সের টাকা দিচ্ছেন। তাহলে সেই কার্ড পাওয়ার ক্রাইটেরিয়া, দেওয়ার ক্রাইটেরিয়া, প্রয়োজনীয়তা সব বিবেচনায় নিয়ে আলোচনা হোক, সমস্যা কী?’
এ সময় জামায়াতের আমির বলেন, ‘নতুন করে পাওয়ার কিছু নাই। আমি বলেছিলাম, সরকারের সুযোগ-সুবিধার যতটুকু না নিয়ে পারি, চেষ্টা করব। আলহামদুলিল্লাহ আমরা তো গাড়ি–বাড়ি নিচ্ছি না। আমার জন্য স্বাভাবিকভাবেই সরকারি প্রটোকল অনুযায়ী একটা গাড়ি আছে, ড্রাইভার আছে, তেল আছে, মেইনটেন্যান্স আছে, সব আছে। আমি লিখিতভাবে জানিয়েছি, আমি কিছুই নেব না এবং আমি নিচ্ছি না।’
সুধী সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সিলেট মহানগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম। মহানগরের সেক্রেটারি মোহাম্মদ শাহজাহান আলীর সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের ও জেলা আমির হাবিবুর রহমান।