পাহাড়ে বন্য হাতির পাল, আতঙ্কে আগাম ধান কাটছেন শেরপুর সীমান্তের কৃষক

শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে হাতির ভয়ে কাঁচা ও আধা পাকা ধান কাটছেন কৃষকেরা। গতকাল শনিবার বিকেলে উপজেলার গজনী গ্রামেছবি: আবদুল মান্নান

শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার গজনী পাহাড়ের ঢালে ৬০ শতক জমিতে ১৬ হাজার টাকা খরচ করে বোরো ধান আবাদ করেন গন্দিগাঁও গ্রামের রাজিব কোচ (৪৮)। গাছে ধান মাত্র পরিপুষ্ট হয়েছে, পাকতে আরও ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগত। কিন্তু পাহাড়ি জঙ্গলে বন্য হাতির ভয়ে ৭০০ টাকা দিন চুক্তিতে ছয়জন শ্রমিক নিয়ে দ্রুত সেই ফসল কেটে বাড়িতে নিচ্ছেন তিনি।

রাজিব কোচ পেশায় একজন অটোরিকশাচালক। স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে তাঁর সংসার। অল্প জমিতে চাষাবাদ করেন মূলত পরিবারের ভাতের চাহিদা মেটাতে।

গতকাল শনিবার দুপুরে সীমান্ত সড়কের পাশে ধানের আঁটির কাছে দাঁড়িয়েছিলেন রাজিব। কথা বলতেই তিনি জবাব দেন, ‘উপায় নাই। হাতির পাল পাহাড়ে আছে। এখন ধান না কাটলে এক রাতেই সব শেষ করে দিবো। পাশে থাকা অনেক খেতের ফসল হাতি নষ্ট করে দিছে। তাই কাঁচা ধানই বাধ্য অইয়া কাটতাছি। পাকবার দিলে আর কিছুই থাকবো না।’

এই শঙ্কা শুধু রাজিবের নয়; জেলার শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় কয়েক শ কৃষক একই আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

গত এক সপ্তাহে ঝিনাইগাতীর গজনী, গন্দিগাঁও ও বাঁকাকুড়া এলাকায় ২০ থেকে ২৫ জন কৃষকের প্রায় ৫ একর জমির ধান খেয়ে ও মাড়িয়ে নষ্ট করেছে বন্য হাতির দল। এতে ফসল রক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকেরা।

শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে হাতির ভয়ে কাঁচা ও আধা পাকা ধান কাটছে কৃষক। সেই ধান কেটে সড়কে রাখা হচ্ছে। দেখাচ্ছেন একজন কৃষক। শনিবার দুপুরে উপজেলার গজনী এলাকার সীমান্ত সড়ক
ছবি: আবদুল মান্নান

বন বিভাগের গজনী বিট কর্মকর্তা সালেহীন নেওয়াজ আজ রোববার সকালে প্রথম আলোকে বলেন, ৪০ থেকে ৪৫টি হাতির একটি দলে প্রায় ১৫টি শাবক আছে। দলটি এক সপ্তাহ ঝিনাইগাতীর বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করে সম্প্রতি নালিতাবাড়ীর সমশ্চূড়া জঙ্গলে চলে গেছে।

কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে তিন উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় ৮ হাজার ৮৫৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে শ্রীবরদীতে ৪ হাজার ৫০১ হেক্টর, ঝিনাইগাতীতে ২ হাজার ২৪০ এবং নালিতাবাড়ীতে ২ হাজার ১১৬ হেক্টর জমি আছে। অধিকাংশ জমির ধান এখন পরিপুষ্ট হলেও পাকতে আরও ২০ থেকে ২৫ দিন সময় লাগবে।

এদিকে হাতির আক্রমণের ভয়ে কৃষকেরা আগেভাগেই ধান কাটতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গন্দিগাঁও গ্রামের কৃষক লাল কৃষ্ণ কোচ (৩৭) বলেন, ‘দুই রাতে আমার এক একর জমির ধান খেয়ে ও মাড়িয়ে নষ্ট করেছে হাতি। এই ধানেই আমগর সংসার চলত। এখন ক্ষতিপূরণের জন্য বন বিভাগের কাছে আবেদন করেছি।’

গতকাল সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সীমান্তবর্তী বালিজুড়ি, খাড়ামুড়া, তাওয়াকুচা, গজনী, রাংটিয়া, সমশ্চূড়া, মধুটিলা ও বারমারি গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে—কোথাও কাঁচা, কোথাও আধা পাকা, আবার কোথাও পরিপুষ্ট ধান কাটার কাজ চলছে।

গজনী গ্রামে পাহাড়ের ঢালে ১০ থেকে ১২ জন নারী শ্রমিক নিয়ে ধান কাটছিলেন অজন্তা সাংমা (৫০)। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পাহাড়ে হাতি আছে। এখন ধান না কাটলে পরে সব নষ্ট কইরা দিবো। তাই ফসল রক্ষায় সবাই ভয়ে আগেই আধা-কাঁচাপাকা ধান কাটতাছে।’

আরও পড়ুন

সমশ্চূড়া গ্রামের কৃষক মো. হানিফ মিয়া (৫৫) বলেন, ‘সীমান্তবর্তী এলাকায় ধান পাকতে আরও ২০ থেকে ২৫ দিন সময় লাগত। কিন্তু ৪০ থেকে ৪৫টি হাতির দল মাঠে নামলে কিছুই করার থাকে না। তাই বাধ্য হইয়া আগেই আধা কাঁচাপাকা ধান কাটতাছি।’

সমশ্চূড়া বিট কর্মকর্তা মো. কাওসার বলেন, হাতির দলটি বর্তমানে সমশ্চূড়া ও বাতকুচি জঙ্গলে অবস্থান করছে। লোকালয়ে যেন ঢুকতে না পারে, সে জন্য এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম ও গ্রামবাসী পাহারায় আছে।

ময়মনসিংহ বন বিভাগের গজনী বিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. তোহিদুল ইসলাম বলেন, গত এক সপ্তাহে হাতির আক্রমণে ২০ থেকে ২৫ জন কৃষকের প্রায় ৫ একর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিপূরণ পেতে কৃষকদের আবেদন করতে বলা হয়েছে। ইতিমধ্যে পাঁচজন আবেদন করেছেন; পাশাপাশি হাতির নিরাপত্তা নিশ্চিতে বন বিভাগ সতর্ক আছে।