বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন মা, জ্ঞান ফিরলেই ছেলেকে এনে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন

মিনু আকতারের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠে পরিবেশ। ছেলের হত্যার বিচার চান তিনি। গতকাল দুপুরে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার কাকারা ইউনিয়নের লোটনী এলাকায়প্রথম আলো

‘আঁর ফোয়া নির্দোষ। ফোয়ারে জোর গরি তুলি লই যাই মারি ফেলাইয়ে। আঁর ফোয়ারে আনি দ তোঁয়ারা।’ ছেলের জন্য এভাবেই চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় আহাজারি করছিলেন নিহত ছাত্রদল নেতা ইসফাতুল ইসলাম ওরফে জিসানের মা মিনু আকতার (৫০)। শোকে কখনো মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদছিলেন তিনি। জ্ঞান হারাচ্ছিলেন ক্ষণে ক্ষণে। জ্ঞান ফিরলেই তাঁর একটাই আকুতি, ‘আমার ছেলেকে এনে দাও।’

ইসফাতুল ইসলাম কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার কাকারা ইউনিয়ন ছাত্রদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। গত রোববার রাতে তাঁকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়ার চার ঘণ্টা পর মহাসড়কের পাশ থেকে লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

গতকাল সোমবার দুপুরে কাকারা ইউনিয়নের লোটনী এলাকায় ইসফাতুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে আছে পরিবেশ। বাড়ির উঠানজুড়ে ভিড় করেছেন প্রতিবেশী ও স্বজনেরা। মায়ের কান্না যেন থামছেই না। মিনু আকতার বলেন, ‘আমার দুই ছেলে আর তিন মেয়ে। জিসানকে মাস্টার্স পাস করিয়েছি। ব্যবসা করত সে। সুখের সময় আমার ছেলেকে মেরে ফেলেছে ওরা।’

রোববার রাত ১১টার দিকে কাকারা ইউনিয়নের সাবের সওদাগরের দোকানের সামনে থেকে ইসফাতুলকে জোর করে একটি নোয়াহ মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়া হয় বলে স্বজন ও স্থানীয় লোকজন জানান। খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দলের নেতা-কর্মী ও স্থানীয় লোকজন বিভিন্ন এলাকায় তাঁর খোঁজ করতে থাকেন। মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানেও তাঁরা পাহারা বসান।

ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা জানান, রোববার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে তাঁদের কাছে খবর আসে, চকরিয়া পৌরসভার সবুজবাগ আবাসিক এলাকার একটি ভবনে ইসফাতুলকে আটকে রাখা হয়েছে। সেখানে নেতা–কর্মীরা গেলে তাঁদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পরে পুলিশ গিয়ে ভবনটিতে তল্লাশি চালায়। এর মধ্যেই খবর আসে, মহাসড়কের পাশে ইসফাতুলের লাশ পড়ে আছে। পুলিশ গিয়ে লাশটি উদ্ধার করে।

নিহত ইসফাতুলের বড় ভাই মো. কায়সার অভিযোগ করেন, অপহরণের পর সবুজবাগ আবাসিক এলাকার একটি ভবনে ইসফাতুলকে আটকে রাখা হয়েছিল। সেখানে মারধরের পর তাঁর মৃত্যু হলে মরদেহ গাড়িতে তুলে মহাসড়কের খুটাখালী ইউনিয়নের মেধাকচ্ছপিয়া ঢালার নির্জন এলাকায় ফেলে দেওয়া হয়।

ইসফাতুলের বাবা নাজেম উদ্দিনও ছেলের মৃত্যুতে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, চকরিয়া পৌর শহরের জনতা শপিং কমপ্লেক্সে কাপড়ের ব্যবসা করতেন ইসফাতুল। দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে সাবের সওদাগরের দোকানের সামনে থেকে তাঁকে তুলে নেওয়া হয়। এরপর হত্যা করে মহাসড়কের পাশে ফেলে দেওয়া হয়। তিনি ছেলের হত্যাকারীদের বিচার দাবি করেন।

নিহত ইসফাতুলের বড় ভাই মো. কায়সার অভিযোগ করেন, অপহরণের পর সবুজবাগ আবাসিক এলাকার একটি ভবনে ইসফাতুলকে আটকে রাখা হয়েছিল। সেখানে মারধরের পর তাঁর মৃত্যু হলে মরদেহ গাড়িতে তুলে মহাসড়কের খুটাখালী ইউনিয়নের মেধাকচ্ছপিয়া ঢালার নির্জন এলাকায় ফেলে দেওয়া হয়।

স্থানীয় লোকজনের দাবি, সবুজবাগ আবাসিক এলাকার ভবনগুলোতে সিসি ক্যামেরা রয়েছে। আবাসিক এলাকায় ঢোকা ও বের হওয়ার পথেও ক্যামেরা আছে। যে ভবনটিতে ইসফাতুলকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে, সেখানেও সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। এসব ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করলে ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটনে সহায়তা হতে পারে বলে তাঁরা মনে করেন।

নিহত ছাত্রদল নেতা ইসফাতুল ইসলাম ওরফে জিসান
ছবি: সংগৃহীত

ইসফাতুলের লাশ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সবুজবাগ আবাসিক এলাকার ওই ভবন থেকে চার নারী ও এক প্রহরীকে আটক করেছে।

পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রেমের ঘটনাকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটন ও কারা এর পেছনে জড়িত, সে বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা যাতে সৃষ্টি না হয়, সে জন্য পুলিশ সতর্ক রয়েছে। আবাসিক এলাকার ওই ভবনে পুলিশের পাহারা বসানো হয়েছে।

স্বজনদের ভাষ্য, ইসফাতুল ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলে। তাঁকে পড়াশোনা করিয়ে প্রতিষ্ঠিত করার পর তাঁর মা-বাবা যখন একটু স্বস্তির সময় কাটানোর কথা ভাবছিলেন, তখনই এমন মৃত্যুতে তাঁদের সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে।