পঞ্চগড়ের রিটার্নিং কর্মকর্তার পদত্যাগের দাবিতে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের বিক্ষোভ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পঞ্চগড়ে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের পদত্যাগের দাবিতে আবারও বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছে ১১-দলীয় জোট। আজ বৃহস্পতিবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে পঞ্চগড় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন তাঁরা।
বেলা পৌনে একটায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে এ কর্মসূচি চলছিল। বিক্ষোভে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ১১-দলীয় জোটের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা অংশ নেন ও বক্তব্য দেন।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, পঞ্চগড়-১ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নওশাদ জমিরের বিভিন্ন নির্বাচনী ফেস্টুন আচরণবিধি লঙ্ঘন করে স্থাপন করা হয়েছে। দ্রুত এসব ফেস্টুন অপসারণের দাবি জানান তাঁরা। তাঁদের দাবি, এর আগে প্রশাসন ১১-দলীয় জোটের প্রার্থীর ফেস্টুন-ব্যানার সরিয়ে ফেললেও বিএনপি প্রার্থীর ক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এতে রিটার্নিং কর্মকর্তা নিরপেক্ষতা হারিয়েছেন। রিটার্নিং কর্মকর্তার পদত্যাগসহ পাঁচ দফা দাবি জানান তাঁরা।
এর আগে গতকাল বুধবার একই দাবিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেন ১১-দলীয় জোটের নেতা-কর্মীরা। সেদিন পাঁচ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়ে কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। পরে বিকেলে জেলা জামায়াতে ইসলামীর কার্যালয় থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিল শেষে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে বসে অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা।
এরই ধারাবাহিকতায় আজ বেলা সোয়া ১১টার দিকে আবারও ১১-দলীয় জোটের অবস্থান কর্মসূচি ও বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভে এনসিপির পঞ্চগড় জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক শিশির আসাদ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পঞ্চগড় শহর শাখার সেক্রেটারি নাসির উদ্দীন সরকারসহ ১১-দলীয় জোটের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীরা বক্তব্য দেন।
আজকের বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘিরে পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি দেখা গেছে। তবে বেলা পৌনে একটা পর্যন্ত জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে বেরিয়ে কোনো কর্মকর্তা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলেননি।
তবে গতকাল রাত সোয়া আটটার দিকে পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা কাজী মো. সায়েমুজ্জামান মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর যেসব ব্যানার-ফেস্টুন গাছ কিংবা বৈদ্যুতিক খুঁটিতে ছিল, সেগুলো আগেই অপসারণ করা হয়েছে। এখন বিক্ষোভকারীরা যেসব বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, সেগুলো জানানোর পর নির্বাচন কমিশনে জানানো হয়। পরে কমিশন থেকে জানানো হয়, সেগুলো ফেস্টুন নয়, ব্যানার। ব্যানার তো বৈধ। নির্বাচন কমিশনের এই বার্তাটি ইতিমধ্যে এনসিপির প্রার্থী সারজিস আলম ও জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির ইকবাল হোসাইনকে জানানো হয়েছে।
বেলা পৌনে একটার দিকে আন্দোলনকারীদের মধ্যে আসেন পঞ্চগড়-১ আসনের ১১-দলীয় জোটের মনোনীত প্রার্থী এনসিপি নেতা সারজিস আলম ও জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির ইকবাল হোসাইন।
এ সময় বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে আমির ইকবাল হোসাইন বলেন, ‘আশা করি আলোচনার মাধ্যমে সুষ্ঠু সমাধান হবে। আপনারা কোনো বিশৃঙ্খলা না করে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যান।’
এই বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে সারজিস আলম ও ইকবাল হোসাইন জেলা প্রশাসকের কক্ষে প্রবেশ করেন। এ সময় বাইরে বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছিলেন সমর্থকেরা।
জেলা প্রশাসনের কাছে ১১-দলীয় জোটের তিন দফা দাবি
রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের সঙ্গে বৈঠক শেষে নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে সারজিস আলম বলেন, ‘কোনো অপশক্তি যদি ক্ষমতার অপব্যবহার, পেশি শক্তি প্রয়োগ, কালো টাকা ব্যবহার করে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে; তাহলে নির্বাচন কমিশন কতটুকু আইনগত ব্যবস্থা নিবে জানি না। তবে আমরা রাজনৈতিকভাবে তাঁদের প্রতিহত করব।’
আলোচনার বিষয়ে এনসিপির এই নেতা বলেন, জেলা প্রশাসনের প্রশাসনের কাছে তাঁরা তিন দফা দাবি তুলে ধরেছেন। দাবিগুলোর মধ্যে প্রথমটি হলো—পঞ্চগড়-১ আসনের পুরো এলাকায় যে ব্যানার ও ফেস্টুন লাগানো হয়েছে, সেগুলো কত সংখ্যক ছাপানো হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রেসের নাম উল্লেখ আছে কি না—তা নিশ্চিত করতে হবে। যেসব ব্যানার ও ফেস্টুনে প্রেসের নাম উল্লেখ নেই, সেগুলো সংশোধন করে পুনরায় লাগানোর জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে আজ বিকেল পর্যন্ত সময় দিতে হবে।
সারজিস আলম বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব ব্যানার ও ফেস্টুন সংশোধন না করলে রাত ১০টার মধ্যে প্রশাসন নিজ উদ্যোগে সেগুলো অপসারণ করবে। একই সঙ্গে তাঁদের পক্ষের কোনো ব্যানার বা ফেস্টুনে এ ধরনের অনিয়ম পাওয়া গেলে প্রশাসন জানালে এক ঘণ্টার মধ্যেই তা অপসারণ করা হবে।
দ্বিতীয় দফা দাবির বিষয়ে সারজিস আলম বলেন, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে ভোটচুরি, রাতের ভোট ও ডামি ভোটের সঙ্গে যুক্ত থেকে যারা প্রিসাইডিং অফিসার ও সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁরা কেউই আসন্ন ২০২৬ সালের নির্বাচনে ওই দায়িত্বে থাকতে পারবেন না। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগামী সপ্তাহের মধ্যে যাচাই-বাছাই করে একটি তালিকা তৈরির আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কোনো দলীয় পদধারী ব্যক্তি যেন প্রিসাইডিং অফিসার বা সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে নিয়োজিত না হন।
সারজিস আলম বলেন, অতীতে শুধুমাত্র মাদ্রাসার শিক্ষক হওয়ার কারণেই অনেককে নির্বাচনী দায়িত্ব থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যা ছিল বৈষম্যমূলক। আওয়ামী লীগ যে বৈষম্য করেছে, তা আর হতে দেওয়া যাবে না।
তৃতীয় দফা দাবির বিষয়ে সারজিস আলম বলেন, নির্বাচনের সময় অন্য ইউএনওদের বদলি করা হলেও তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) এখনো বদলি করা হয়নি। সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে এ সপ্তাহের মধ্যেই তেঁতুলিয়ায় নতুন ইউএনও নিয়োগ করতে হবে।