শতবর্ষ পূর্তিতে গান-গল্প-আড্ডায় মাতলেন সবাই

কলাবাড়ী -রামনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদ্‌যাপন অনুষ্ঠানে প্রিয় শিক্ষককে কাছ পেয়ে ফটোসেশনে মেতে ওঠেন সাবেক শিক্ষার্থীরা। আজ সোমবার দুপুরেছবি: প্রথম আলো

চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদার রামনগর গ্রামের কলাবাড়ী-রামনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শতবর্ষপূর্তি উৎসবে গান-গল্প-আড্ডায় মাতল প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা। অনুষ্ঠানে স্বামী-স্ত্রী, সন্তান এমনকি নাতি-পুতি নিয়েও উপস্থিত হন অনেকেই। একসময়ের সহপাঠীকে কাছে পেয়ে গল্পে-স্মৃতিচারণায় তাঁরা ফিরে যান শৈশব-কৈশোরের স্কুলের দিনগুলোতে।

শতবর্ষ উদ্‌যাপন উপলক্ষে বিদ্যালয় মাঠে স্থাপিত ফটোবুথসহ দল বেঁধে ছবি তোলেন, তোলেন সেলফি, ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে কাছে পেয়ে বয়স ভুলে কেউ কেউ আবার আবেগে বুকে জড়িয়ে ধরেন। কেউ কেউ বলে ওঠেন, ‘বন্ধু, কী খবর বল, কত দিন দেখা হয়নি।’

‘শতবর্ষ উদ্‌যাপনে, এসো মিলি হৃদয়ের টানে’ স্লোগান সামনে রেখে আজ সোমবার  কলাবাড়ী-রামনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ওই শতবর্ষ উদ্‌যাপনের আয়োজন করা হয়। উদ্‌যাপন উপলক্ষে এলাকায় একাধিক তোরণ নির্মাণ, বিদ্যালয় মাঠে বিশাল প্যান্ডেল, জায়ান্ট স্ক্রিন স্থাপন এবং ‘শতসূর্য স্মারক’ নামে স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করা হয়। ২ হাজারের বেশি প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেন। আয়োজন করা হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। কৃতী তিন শিক্ষার্থী এবং প্রয়াত চার গুণীজনকে জানানো হয় সম্মাননা।

দুপুর ১২টায় জাতীয় সংগীতের সুরে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। এরপর ১০০টি বেলুন উড়িয়ে এবং শান্তির প্রতীক কবুতর অবমুক্তকরণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।

উদ্বোধনের পর শতবর্ষ উদ্‌যাপন কমিটির আহ্বায়ক ১৯৮৮ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ওয়ালিউর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান মঞ্চের মূল আয়োজন করা হয়। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আজ গৌরবময় ঐতিহাসিক দিন। আজকের দিনে বিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থীদের প্রতি অনুরোধ, ভবিষ্যতে কে কোন পেশায় যাবে, সেটা বড় কথা নয়। সবার আগে ভালো মানুষ হতে হবে। নৈতিক মূল্যবোধ শিখতে হবে।’

উদ্‌যাপন কমিটির সদস্যসচিব প্রাক্তন ছাত্র পাবনা মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক খন্দকার মেহেদী ইবনে মোস্তফা স্বাগত বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১০০ বছর পূর্তি শুধু সময়ের পরিমাপ নয়, এটা একটা দীর্ঘ সংগ্রাম, ঐতিহ্য, সাফল্য ও অগণিত মানুষের ভালোবাসা ও অবদানের প্রতিফলন। এখান থেকে গড়ে উঠেছেন অসংখ্য মেধাবী ও দেশপ্রেমী মানুষ। যাঁরা দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রেখে চলেছেন। বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা এবং পরিচালনার সঙ্গে যেসব গুণী জড়িত, তাঁদের গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।’

প্রধান অতিথি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেনের পক্ষে অনুষ্ঠানে আসেন দামুড়হুদার সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহিন আলম। তিনি বলেন, ‘সাধারণত বেশির ভাগ বাবা-মা তাঁদের সন্তানকে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে একপ্রকার চাপ সৃষ্টি করে থাকেন। আমার বক্তব্য হচ্ছে, সবাইকে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার দরকার নেই। প্রত্যেকের পেশার স্বাধীনতা থাকা উচিত। সে ক্ষেত্রে শিক্ষক, খেলোয়াড় ও সাংবাদিক হয়েও অনেক ভালো কাজ করা যায়, দেশের জন্য অবদান রাখা যায়।’

বিশেষ অতিথি পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রুহুল কবীর খানের পক্ষে অনুষ্ঠানে এসে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মিনহাজুল ইসলাম বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘শতবর্ষ উদ্‌যাপন উপলক্ষে নতুন-পুরোনো শিক্ষার্থীদের এই মিলনমেলা নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ।’

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনেকেই স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আইনজ্ঞ, শিল্পোদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিক হয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে বিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদ্‌যাপনে যোগ দিতে পেরে আমি গর্বিত।’

সালেকীন আহমেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জেসমিন আরা খাতুন, বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক গিয়াস উদ্দিন বিশ্বাস, অনুষ্ঠানের মূল সমন্বয়ক আর্থমুভিং সলিউশনের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মুজিবুল হক, প্রকৌশলী গোলাম মোস্তফা, জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি শামীম রেজা, জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ওয়াহেদুজ্জামান, সাবেক চেয়ারম্যান ইদ্রিস আলি, রয়ের গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সালাহউদ্দিন, বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী জাকিয়া সুলতানা প্রমুখ বক্তব্য দেন।

১৯৮৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী শাহীন আক্তার বর্তমানে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী। স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলেন, ‘সে সময়ে মেয়েদের শিক্ষা ছিল খুবই চ্যালেঞ্জিং। তারপর আমি ছিলাম খন্দকার বাড়ির মেয়ে। কিন্তু রিনা ফুফু ও আইরিন আপুর প্রেরণায় আমি দলিয়ারপুর গ্রাম থেকে এই বিদ্যালয়ে পড়তে আসতাম। শিক্ষকদের আন্তরিক প্রচেষ্টা-উৎসাহে সফলতা পেয়েছি। আরও চার ভাই বোন এই স্কুল থেকে পড়ে আজ স্ব-স্ব ক্ষেত্রে সফল মানুষ।’