‘মোবাইলের মালিক মারা গেছে, হাসপাতালে আসেন’
গতকাল বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে আটটা। প্রতিদিনের মতো স্ত্রী পলি দত্তের (৩৬) ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন স্বামী কাজল দত্ত। চট্টগ্রামের আনোয়ারার কোরিয়ান রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলে (কেইপিজেড) কাজ শেষে স্ত্রী কত দূর এসেছেন, তা জানতে মুঠোফোনে কল করেন তিনি। কিন্তু ওপাশ থেকে ভেসে আসে অচেনা এক কণ্ঠ। অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, ‘মোবাইলের মালিক মারা গেছে, হাসপাতালে আসেন।’
কথাটি শুনে স্তব্ধ হয়ে যান কাজল দত্ত। দ্রুত আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখেন, স্ত্রীর নিথর দেহ পড়ে রয়েছে। পরে জানতে পারেন, সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে।
এর আগে গতকাল রাত আটটার দিকে আনোয়ারা উপজেলার চাতরী চৌমুহনী বাজারের টানেল মোড়ে একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কয়েকটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাকে ধাক্কা দেয়। এতে পলি দত্তসহ অটোরিকশার দুই যাত্রী নিহত হন এবং আহত হন অন্তত ২০ জন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
আজ শুক্রবার দুপুরে উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নের ঝিওরী গ্রামে পলি দত্তের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, শ্মশানে শেষকৃত্য শেষে ঘরে ফিরে জিনিসপত্র গুছিয়ে পরিষ্কার করছেন কাজল দত্ত; পাশে রয়েছেন তাঁদের দুই ছেলে সৈকত দত্ত (১৮) ও বিজয় দত্ত (১৫)।
কাজল দত্ত বলেন, তিনি ছোটখাটো অনুষ্ঠানে বাবুর্চির কাজ করেন। যেদিন যে কাজ পান, তা দিয়েই সংসার চলে। অভাবের সংসারে স্বস্তি আনতেই ১২ বছর আগে কেইপিজেডে চাকরি নেন তাঁর স্ত্রী। তাঁর আয়ে সংসারের ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি দুই ছেলের লেখাপড়ার খরচ চলত।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে বড় ছেলে সৈকত দত্ত বলেন, ‘মা অনেক কষ্ট করে আমাদের পড়াশোনা করিয়েছেন। প্রতিদিন চাকরি শেষে ফেরার সময় বাজার ও আমাদের জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসতেন। স্বপ্ন ছিল মায়ের মুখে হাসি ফোটাব। তা আর পারলাম না।’
বিজয় দত্ত দশম শ্রেণিতে পড়ে। মায়ের কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিল সে। সে বলে, ‘সকালে মা রান্না করে কাজে যেতেন। আমি খেয়ে স্কুলে যেতাম। এখন কে আমাকে খাওয়াবে, কে আদর করবে?’
স্ত্রীকে হারিয়ে শোকে কাতর স্বামী শিমুল শীল
দুর্ঘটনায় পলি দত্ত ছাড়া নিহত আরেকজন হলেন ইফা শীল (৩৫)। তিনিও পলি দত্তের সঙ্গে একই কারখানায় কাজ করতেন। তিনি উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নের ঝিওরী গ্রামের শিমুল শীলের স্ত্রী।
আজ দুপুরে উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নের ঝিওরী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ইফা শীলের শেষকৃত্য চলছে। শ্মশানে ধর্মীয় সংগীত বাজছে। কেউ শেষকৃত্যের কাজে ব্যস্ত, কেউ সড়কের ধারে দাঁড়িয়ে দুর্ঘটনার কথা বলছেন।
পুত্রসন্তান না থাকায় স্ত্রীর মুখাগ্নির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন শিমুল শীল। কথা বলতে গিয়ে বারবার ভেঙে পড়ছিলেন তিনি। শিমুল বলেন, তাঁদের আদি বাড়ি বাঁশখালীতে। প্রায় ২৫ বছর আগে মা–বাবাকে নিয়ে ঝিওরী গ্রামে বসবাস শুরু করেন। ২০ বছর আগে ইফার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। আর্থিক সংকটের কারণে তাঁরা ভাড়া বাসাতেই থাকেন।
শিমুল শীল বলেন, ‘আমি সেলুনে কাজ করে তেমন আয় করতে পারি না। আমার স্ত্রী ১৩ বছর ধরে কেইপিজেডে চাকরি করে আসছে। তার উপার্জন আর পাঁচ লাখ টাকা ঋণ করে চার মাস আগে বড় মেয়ে নন্দিতার বিয়ে দিয়েছি। ছোট মেয়ে রাধিকার বয়স সাত বছর। সে এখনো জানে না, তার মা আর বেঁচে নেই। আমি একেবারে কূলহারা হয়ে গেলাম।’
আনোয়ারা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মজনু মিয়া বলেন, কেইপিজেডের শ্রমিকবাহী একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তিনটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও একটি ব্যাটারিচালিত রিকশাকে ধাক্কা দেয়। এতে দুজন নিহত ও অন্তত ২০ জন আহত হন। আহত ব্যক্তিদের আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।