ডাকযোগে পরচা পেতে আবেদন
শরীয়তপুরে ১৫ দিনের তথ্য জানতে সময় লাগছে এক বছরের বেশি
জেলায় ডাকযোগে পরচার আবেদন করা হয়েছে ৭৮৮টি। তবে প্রতিশ্রুত সময়ের মধ্যে অনেকে পরচা পাননি।
২০২২ সালের মার্চে ডাকযোগে ভূমিসেবা দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয় শরীয়তপুরে। কিন্তু অনলাইনে আবেদন করে ডাকযোগে গ্রাহক সময়মতো পরচা পাচ্ছেন না। যে পরচা ১০-১৫ দিনের মধ্যে ডাকযোগে দেওয়ার কথা, তা অনেকে এক-দেড় বছর অপেক্ষা করেও পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন। পরচা না এলে নিদেনপক্ষে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন করা পরচার বিষয়ে তথ্য দেওয়ার কথা থাকলেও সেটিও গ্রাহককে জানাতে বছর পার হয়ে যাচ্ছে।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্র জানায়, জমির পরচা সংগ্রহ করতে হলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে আগে নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হতো। আবেদনের ৭ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে রেকর্ডরুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনারের দপ্তর থেকে গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী পরচা সরবরাহ করা হতো। মানুষ যাতে সহজে ও দ্রুত সময়ে পরচা পেতে পারেন, তার জন্য ২০২১ সাল থেকে দেশে অনলাইনে ভূমিসেবা কার্যক্রম চালু করে সরকার। এর মাধ্যমে অনলাইনে আবেদন করে ডাকযোগে পরচা পাওয়ার ব্যবস্থা চালু হয়। পরের বছর শরীয়তপুরে এ সেবা চালু করা হয়।
একজন গ্রাহক পরচা পেতে অনলাইনে আবেদন ফরম পূরণ করলে দুটি অপশন আসে। একটি ডাকযোগে, আরেকটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে সশরীর সংগ্রহ করা। ডাকযোগে পেতে গ্রাহককে ১৪০ টাকা ফি দিতে হয়। আর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে নিতে হলে গ্রাহককে ১০০ টাকা ফি দিতে হয়। গত বছর জুন থেকে এ বছরের জুন পর্যন্ত এক বছরে অনলাইনে পরচার জন্য ৪২ হাজার ৭৭০টি আবেদন করা হয়েছে। আর ডাকযোগে পরচার আবেদন করা হয়েছে ৭৮৮টি। তবে প্রতিশ্রুত সময়ের মধ্যে অনেকে পরচা পাননি।
ভেদরগঞ্জ উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের ইকরকান্দি মৌজার বিআরএস পরচা ডাকযোগে পেতে গত বছরের ২০ মার্চ আবেদন করেন সোহাগ শেখ। ১৪ মাস পর তাঁকে চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে, সার্ভারে যান্ত্রিক ত্রুটি থাকায় ডাকঘরের মাধ্যমে পরচা পৌঁছানো যায়নি। আবেদনের কপি নিয়ে তাঁকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রেকর্ডরুম শাখায় যোগাযোগ করতে বলা হয়।
সোহাগ শেখ মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি ঢাকায় থাকি। শ্বশুরবাড়ির একটি জমি-সংক্রান্ত জটিলতার জন্য বিআরএস পরচা সংগ্রহ করার জন্য ঢাকা থেকে অনলাইনে আবেদন করেছিলাম। কিন্তু পরচা পাইনি। সময় বের করে আর যেতে পারিনি। তাই পরচার অভাবে জমি নিয়ে বিবাদের সমাধানটাও করতে পারিনি।’
জানতে চাইলে শরীয়তপুর রেকর্ডরুম ডেপুটি কালেক্টর আবদুর রহিম প্রথম আলোকে জানান, এসএ, সিএস ও আরএস পরচা শরীয়তপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে সার্ভারে এন্ট্রি করা হয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের সার্ভারের আর্কাইভে তা সংরক্ষণ করা হয়েছে। এরপর অনলাইনে আবেদন করার পর ওই পরচা ডাক বিভাগের সার্ভারে চলে যায়। ২০০৮ সালে শরীয়তপুরে জমির সর্বশেষ জরিপ বিআরএসের গেজেট প্রকাশ হয়। কিন্তু বিআরএসের ওই জমির পরচা এখনো ভূমি মন্ত্রণালয়ের সার্ভারে (শরীয়তপুরের) সংরক্ষণ করা হয়নি। ভূমি জরিপ অধিদপ্তর বিআরএস পরচা সার্ভারে এন্ট্রি দেওয়ার কথা।
আবদুর রহিম বলেন, ‘যে পরচাগুলো আমাদের সার্ভারে এন্ট্রি দেওয়া নেই, তা আমরা স্ক্যান করে প্রিন্ট কপি গ্রাহকদের সরবরাহ করি। কিন্তু কোনো জমির পরচা সার্ভারে না থাকলে ডাকযোগে দেওয়া হয় না। যাঁরা অনলাইনে আবেদন করে ডাকযোগে পাননি, তাঁদের রেকর্ডরুমে এসে সংগ্রহ করতে হবে।’
বিআরএস পরচা সার্ভারে না থাকার কথা বলা হলেও সিএস ও আরএস পরচাও সময়মতো না পাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার নলমুড়ি ইউনিয়নের চরভূয়াই গ্রামের মোহাম্মদ নুরুজ্জামান ঢাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালান। পারিবারিক প্রয়োজনে তিনি লাবনকাঠি মৌজার আরএস পরচা পেতে ২০২১ সালের ১২ ডিসেম্বর অনলাইনে আবেদন করেন। তাঁকে কোনো পরচা সরবরাহ করা হয়নি। এক বছর পাঁচ মাস পর ডাকযোগে একটি চিঠি দিয়ে তাঁকেও সার্ভারে ত্রুটির কথা বলে আবেদনের কপি নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রেকর্ডরুম শাখায় যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
মোহাম্মদ নুরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি ঢাকায় থাকি। নিয়মিত গ্রামে যেতে পারি না। পৈতৃক সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে কিছু সমস্যা সৃষ্টি হওয়ায় আরএস পরচার প্রয়োজন ছিল। ডাকঘরের মাধ্যমে পাওয়ার জন্য অনলাইনে আবেদন করেছিলাম। পরচা পাইনি। ১৫ মাস পর রেকর্ডরুমে যোগাযোগ করতে বলা হলে আমি আর যেতে পারিনি।’
ভেদরগঞ্জের রামভদ্রপুর গ্রামের মেহেদী হাসান পবলেন, ‘গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে অনলাইনে আবেদন করেছিলাম সিএস পরচার জন্য। ১০ দিনের মধ্যে ওই পরচা ডাকযোগে আমাদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এক বছর হয়ে গেছে, এখনো পরচা পাইনি। কেন পরচা দেওয়া হয়নি, তা-ও আমাকে জানানো হয়নি।’
জানতে চাইলে শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ নিজাম উদ্দীন আহাম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, বিআরএস পরচা এখনো সার্ভারে এন্ট্রি করা হয়নি। অল্প সময়ের মধ্যে সব পরচা সার্ভারে এন্ট্রি দেওয়া হবে। ভূমি জরিপ অধিদপ্তর ও ভূমি মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করছে। যে পরচাগুলো সার্ভারে নেই, তা এই মুহূর্তে ডাকযোগে দেওয়া যাচ্ছে না। তাঁদের বিকল্পভাবে রেকর্ডরুম থেকে আবেদন করে সংগ্রহ করতে হবে। আর গ্রাহককে জানাতে এক বছর ও তার বেশি সময় লাগার কথা নয়। কেন এমন ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখা হবে।