বরিশাল সিটি নির্বাচন
মাঠ ছাড়া নিয়ে বিএনপিতে অস্বস্তি
বিএনপি নির্বাচন না করলে আওয়ামী লীগ সহজে নির্বাচনী বৈতরণি পার হয়ে যাবে। ইসলামী আন্দোলন প্রার্থীর দিকে বিএনপির ভোটাররা ঝুঁকতে পারেন।
সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ায় বরিশালে দলটির স্থানীয় নেতারা অনেকটা অস্বস্তিতে আছেন। কেননা, বরিশালে বিএনপি সাংগঠনিকভাবে বেশ শক্তিশালী এবং বড় ভোট ব্যাংক রয়েছে বলে মনে করেন স্থানীয় নেতারা। সে ক্ষেত্রে তাঁরা সমর্থক ভোটারদের জন্য কী করবেন, নাকি সহজে মাঠ ছেড়ে দেবেন—এ নিয়ে দোটানায় আছেন।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের গত নির্বাচনে দলটির প্রার্থী ছিলেন কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মজিবর রহমান সরোয়ার। ওই সময় তিনি বরিশাল মহানগর বিএনপিরও সভাপতি ছিলেন। এবার দল অংশ নিলেও তিনি মেয়র পদে প্রার্থী হবেন না, তা আগেভাগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন।
দলের কয়েকজন নেতা জানান, বরিশালে বিএনপির বড় ভোট ব্যাংক রয়েছে। সে ক্ষেত্রে তারা চাইবে না, ক্ষমতাসীন দল নির্বিঘ্নে নির্বাচনী বৈতরণি পার হয়ে যাক। সে ক্ষেত্রে তারা কিছু একটা করে দেখাতে পারেন শেষ পর্যন্ত। এ জন্য মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
বিএনপি এই নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় দলটির সমর্থক ভোটাররা বিকল্প খুঁজবেন। সে ক্ষেত্রে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী তাঁদের কাছে ভালো বিকল্প হয়ে উঠতে পারেন। এটা হলে এবারই প্রথম ইসলামী আন্দোলন প্রার্থী বরিশাল সিটিতে ক্ষমতাসীন দলের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেন।শাহ সাজেদা, বরিশাল জেলার সাবেক সভাপতি অধ্যাপক
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বরিশালে বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিয়ে উভয়সংকটে পড়েছে। একদিকে দলটি এই নির্বাচনে বিকল্প কিছু না ভাবলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কোনো বাধা ছাড়াই নির্বাচনী বৈতরণি পার হয়ে যাবে, তাতে সন্দেহ নেই। অন্যদিকে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীর দিকে বিএনপির সমর্থক ভোটাররা ঝুঁকে পড়লে সে ক্ষেত্রে ইসলামী আন্দোলন প্রার্থী জয়ী হতে না পারলেও তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়তে সক্ষম হবেন এবং ভালো ভোট পেয়ে দলটি দেশজুড়ে আলোচনায় চলে আসতে পারে।
এতে বরিশালের রাজনীতিতে বিএনপির পুরোনো সাংগঠনিক ঐতিহ্য ও ভোটের শক্তির গর্ব খর্ব হতে পারে। এমনকি দলটি স্থানীয় রাজনীতিতে বিএনপির বিকল্প শক্তি হয়ে উঠতে পারে। তা ছাড়া বিএনপির সঙ্গে চরমোনাই পীরের দলটির স্থানীয়ভাবে সম্পর্ক ভালো নয়। জাতীয় রাজনীতিতেও বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং অন্যান্য দাবির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনেও সায় দেয়নি এই দল। এ জন্য সব মিলিয়ে আসন্ন সিটি নির্বাচনে বিএনপি কৌশলগত দিক থেকে কিছুটা বেকায়দায় পড়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।
সিটি করপোরেশনে বিএনপির অংশ না নেওয়ার বিষয়টি বরিশালে বিএনপির স্থানীয় নেতাদের অস্বস্তিতে ফেলেছে বলে মনে করেন সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) বরিশাল জেলার সাবেক সভাপতি অধ্যাপক শাহ সাজেদা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপি এই নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় দলটির সমর্থক ভোটাররা বিকল্প খুঁজবেন। সে ক্ষেত্রে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী তাঁদের কাছে ভালো বিকল্প হয়ে উঠতে পারেন। এটা হলে এবারই প্রথম ইসলামী আন্দোলন প্রার্থী বরিশাল সিটিতে ক্ষমতাসীন দলের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেন। সেটা দীর্ঘ মেয়াদে বরিশালে বিএনপির রাজনীতির জন্য একটা বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে হচ্ছে।
‘দেশে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না, এটা প্রমাণিত সত্য। সে ক্ষেত্রে এই নির্বাচনে কী হলো না হলো, তা ভবিষ্যৎ রাজনীতির মুখ্য বিষয় নয়। কারণ, বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকার আন্দোলনে দেশের মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন রয়েছে। বরিশাল নগরের ভোটাররাও এ ব্যাপারে সচেতন। আর দেশের সব রাজনৈতিক দল যেখানে এই দাবির সঙ্গে একমত, সেখানে ইসলামী আন্দোলন ভোটে গিয়ে সরকারের বিতর্কিত নির্বাচনকে বৈধতা দিচ্ছে। এ জন্য আমরা মনে করি, ইসলামী আন্দোলন আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্তে সহমত পোষণকারী একটি দল।’মনিরুজ্জামান খান, নগর বিএনপির আহ্বায়ক
বিএনপি নেতারা এমনটা মনে করছেন না। নগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান বলেন, ‘দেশে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না, এটা প্রমাণিত সত্য। সে ক্ষেত্রে এই নির্বাচনে কী হলো না হলো, তা ভবিষ্যৎ রাজনীতির মুখ্য বিষয় নয়। কারণ, বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকার আন্দোলনে দেশের মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন রয়েছে।
বরিশাল নগরের ভোটাররাও এ ব্যাপারে সচেতন। আর দেশের সব রাজনৈতিক দল যেখানে এই দাবির সঙ্গে একমত, সেখানে ইসলামী আন্দোলন ভোটে গিয়ে সরকারের বিতর্কিত নির্বাচনকে বৈধতা দিচ্ছে। এ জন্য আমরা মনে করি, ইসলামী আন্দোলন আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্তে সহমত পোষণকারী একটি দল।’
দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও গত নির্বাচনে দলের মেয়র প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, ‘আমরা অবশ্যই বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি। গত নির্বাচনে দুপুর ১২টার মধ্যে ভোট শেষ হয়ে গিয়েছিল। আমাকে প্রচারণার মাঠে নামতে দেওয়া হয়নি। আমার নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার, মামলা দিয়ে কারাবন্দী করা হয়েছিল। একটা ভয়ংকর, ভুতুড়ে ও আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছিল বরিশালে। সে ক্ষেত্রে এবার হয়তো সে রকম আগ্রাসী ভূমিকায় থাকবে না সরকারি দল, যেটা থাকত সাদিক আবদুল্লাহ মনোনয়ন পেলে। এ জন্য এবার প্রার্থীরা ভোটের মাঠে কিছুটা স্বাভাবিক পরিবেশ পেলেও পেতে পারেন।’
বিএনপি যদি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেয়, তাহলে সিদ্ধান্ত কী হবে, প্রশ্নে মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, ‘সেটা দলের হাইকমান্ড বিবেচনা করবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী দলই ঠিক করবে কাকে দিলে ভালো হবে। তবে ভবিষ্যতে বিএনপি নির্বাচনে গেলে আমি জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে চাই। স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে কোনো আগ্রহ নেই।’
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন আগামী ১৬ মে। মনোনয়নপত্র বাছাই হবে ১৮ মে। ২৫ মের মধ্যে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করা যাবে। ২৬ মে প্রতীক বরাদ্দের দিনক্ষণ ধার্য রয়েছে। এরপর ১২ জুন ভোট গ্রহণ হবে।
বরিশালে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন আবুল খায়ের আবদুল্লাহ ওরফে খোকন সেরনিয়াবাত। তিনি বর্তমান মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ চাচা এবং বর্ষীয়ান আওয়ামী লীগ নেতা আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর ছোট ভাই।
এ ছাড়া জাপার প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন ইকবাল হোসেন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপির প্রয়াত মেয়র আহসান হাবিব কামালের ছেলে কামরুল আহসান। ইসলামী আন্দোলন নির্বাচনে অংশ নিলেও গতকাল সোমবার পর্যন্ত দলটি প্রার্থী চূড়ান্ত করেনি।