ছয় দিন বন্ধ থাকার পর মেরামত করা ইঞ্জিনে ‘গরিবের ট্রেন’ চলাচল শুরু
লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিন–সংকটে ছয় দিন বন্ধ থাকার পর ভৈরব–ময়মনসিংহ রেলপথে আবার চলতে শুরু করেছে ময়মনসিংহ মেইল। গতকাল রোববার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম থেকে ইব্রাহিমাবাদের উদ্দেশে ট্রেনটি ছেড়ে যায়। তবে নির্ধারিত সময়ের প্রায় তিন ঘণ্টা পর ট্রেনটি ছাড়া হয়। মেরামত করা একটি ইঞ্জিন দিয়ে আপাতত ট্রেনটি চালু করা হয়েছে বলে রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয় মানুষের কাছে ট্রেনটি নাসিরাবাদ মেইল নামে পরিচিত। ২৪ আগস্ট থেকে ট্রেনটির চলাচল বন্ধ ছিল। এতে ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথের ২৭টি স্টেশনের যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েন। কম ভাড়ায় চলাচলের সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমজীবী মানুষ সমস্যায় পড়েন। এ নিয়ে গত শনিবার প্রথম আলোর প্রথম পাতায় ‘ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথ “গরিবের ট্রেন” একে একে সব বন্ধ, ভোগান্তিতে মানুষ’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। পরদিন রোববার একই বিষয়ে সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়। এরপরই ট্রেনটি আবার চালু করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
একসময় ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথে ছয়টি লোকাল ও মেইল ট্রেন চলাচল করত। ১০-২০ টাকা ভাড়া দিয়ে সেসব ট্রেনে মানুষ পৌঁছে যেতেন দূরের বাজারে, কর্মস্থলে কিংবা বাড়িতে। এ কারণে এগুলো ‘গরিবের ট্রেন’ হিসেবে পরিচিত। করোনাকালে এই পথের চারটি লোকাল ও একটি মেইল ট্রেন বন্ধ হয়ে যায়। বাকি ছিল ময়মনসিংহ মেইল। সেটিও গত সোমবার বন্ধ হয়ে গেলে ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ।
বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী (পূর্ব) সাদেকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, নাসিরাবাদ মেইলটি একশ্রেণির মানুষের জন্য খুবই প্রয়োজন। এ কারণে দ্রুত ট্রেনটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বেশ কিছু অকেজো ইঞ্জিনের মেরামতকাজ চলছে। নাসিরাবাদ চালু রাখতে মেরামত করা একটি ইঞ্জিন দিয়ে আপাতত ট্রেনটির চলাচল ধরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ময়মনসিংহ মেইল (৩৭ আপ) চট্টগ্রাম থেকে ইব্রাহিমাবাদের উদ্দেশে ছাড়ার নির্ধারিত সময় বিকেল ৪টা ১৫ মিনিট। রোববার ট্রেনটি চট্টগ্রাম স্টেশন ছাড়ে সন্ধ্যা ৭টা ১৭ মিনিটে। অর্থাৎ প্রায় তিন ঘণ্টা দেরিতে।
কারণ হিসেবে রেলওয়ের কর্মীরা জানিয়েছেন, ট্রেনটি রোববার থেকে আবার চলবে, এমন তথ্য আগেভাগে স্টেশনের কেবিনে ছিল না। স্টেশন মাস্টারসহ সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তাও বিষয়টি আগে থেকে জানতেন না। হঠাৎ করে ট্রেনটি চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বগিগুলো যাত্রী পরিবহনের উপযোগী করতে কিছুটা সময় লাগে। যাত্রীদেরও আগাম জানানো সম্ভব হয়নি। ফলে চালুর প্রথম দিন ট্রেনে যাত্রী ছিল অন্য দিনের তুলনায় কম। সাধারণত চট্টগ্রাম স্টেশন থেকেই ট্রেনটির বগি যাত্রীতে পূর্ণ হয়ে যায়। গতকাল ছিল প্রায় অর্ধেক।
নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ভৈরব বাজার স্টেশনে নাসিরাবাদ মেইলের যাত্রাবিরতির সময় রাত ১১টা ৪২ মিনিট। গতকাল ট্রেনটি ভৈরবে পৌঁছায় রাত সাড়ে তিনটার দিকে। ট্রেনটি ভৈরব স্টেশন ছেড়ে যায় ভোর ৪টা ৫ মিনিটে। ভৈরব স্টেশনে ট্রেন থেকে প্রায় ৫০ প্যাকেট মালামাল নামানো হয়।
ভৈরব স্টেশনের স্টেশন মাস্টার ইউসুফ প্রথম আলোকে বলেন, এত দ্রুত ট্রেনটি ফিরে আসবে, এমন ধারণা ছিল না। ট্রেনটি চালু হওয়ায় কর্মস্থল থেকে বাড়ি যাতায়াতকারী শ্রমজীবী মানুষের জন্য আবার সাশ্রয়ী একটি পথ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ট্রেনটির নিয়মিত যাত্রীদের বড় একটি অংশ ইতিমধ্যে জানত যে ট্রেনটি বন্ধ হয়ে গেছে। এর ওপর প্রথম দিন ট্রেনটি নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে ভৈরবে এসেছে। এ কারণে যাত্রী কম ছিল। কয়েক দিনের মধ্যে মানুষ জেনে গেলে আগের মতো যাত্রী হবে।
সোমবার বেলা পৌনে একটার দিকে ভৈরব স্টেশনের ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার জন্য অনেক শ্রমজীবী মানুষ অপেক্ষা করছেন। তাঁদের অনেকে কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার বিভিন্ন এলাকা থেকে সড়কপথে ভৈরবে এসেছেন।
ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার আঠারবাড়ি গ্রামের কৃষিশ্রমিক রইছ উদ্দিন (৫০) ও শামিম মিয়া (৫২) চট্টগ্রাম যাওয়ার জন্য ভৈরব স্টেশনে অপেক্ষা করছিলেন। নাসিরাবাদ মেইল আবার চালু হয়েছে—এ কথা শুনে তাঁরা খুশি হন। রইছ উদ্দিন বলেন, ‘ভৈরব পর্যন্ত আইতে আড়াই শ টেহা খরচ হইয়া গেছে। নাসিরাবাদ থাকলে এই টেহা লাগত না। বাড়ি থাইক্কা আইতে না পারলেও এখন যাইতে পারুম—এটাই আনন্দ।’
বাংলাদেশ রেলওয়ের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট (পূর্ব) মোহাম্মদ সফিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বাধ্য হয়েই ট্রেনটি বন্ধ করে দিতে হয়েছিল। সবকিছু মিলিয়ে ইঞ্জিনের ব্যবস্থা হয়েছে। এ জন্য চালু করা গেছে। ট্রেনটি আপাতত চালানো হচ্ছে, নাকি নিয়মিত চালানো হবে—এমন প্রশ্নে তাঁর উত্তর, যত দিন ইঞ্জিন সচল থাকবে, তত দিন নাসিরাবাদ মেইল নিয়মিত চলবে। ইঞ্জিনের সমস্যা হলে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।