হাওরে ধানকাটা : শ্রমিকসংকট মোকাবিলায় যাদুকাটা নদীতে বন্ধ হচ্ছে বালু উত্তোলন
সুনামগঞ্জের হাওরে বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। তবে অনেক হাওরে বৃষ্টির পানি জমে আছে। এ কারণে কম্বাইন্ড হারভেস্টর দিয়ে ধান কাটায় সমস্যা হচ্ছে। এদিকে সেখানে শ্রমিকসংকট দেখা দিয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে কৃষকদের সুবিধার্থে আগামীকাল সোমবার থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত জেলার বৃহৎ যাদুকাটা নদীতে বালু উত্তোলন ও পরিবহন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এতে ১০–১৫ হাজার শ্রমিক হাওরে ধান কাটায় যুক্ত হবেন বলে মনে করা হচ্ছে। যাদুকাটা নদী তাহিরপুর উপজেলায় অবস্থিত।
গতকাল শনিবার বিকেলে সুনামগঞ্জ-১ আসনের (তাহিরপুর, ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ ও মধ্যনগর) সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুলের নির্দেশনায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে নদীতে নৌকা নিয়ে মাইকিং করা হয়। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান মানিক।
উপজেলা ভূমি কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা মাইকিং করেন। তিনি জানান, হাওরে বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। ধান কাটায় শ্রমিকসংকট মোকাবিলা এবং কৃষকদের সুবিধার জন্য সংসদ সদস্যের নির্দেশনায় যাদুকাটা নদীতে ১০ দিন বালু উত্তোলন ও পরিবহন বন্ধ থাকবে। এই আদেশ কেউ অমান্য করলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কৃষকেরা জানান, এবার চৈত্র মাসের শুরু থেকেই সুনামগঞ্জে বৃষ্টি হচ্ছে। প্রথমে হালকা পরে ভারী বৃষ্টি হওয়ায় বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। অনেক হাওরের ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। কোথাও কোথাও ধান তলিয়ে গেছে। হাওরগুলোর নিচু অংশে জমে আছে বৃষ্টির পানি। জেলার বেশ কয়েকটি হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা করেছেন কৃষকেরা। আবার কোথাও কোথাও নিজেদের উদ্যোগে পাম্প বসিয়ে পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু হাওরের জমিতে পানি থাকায় এবার কম্বাইন্ড হারভেস্টর বা রিপার দিয়ে ধান কাটায় সমস্যা হচ্ছে।
কৃষকেরা বলছেন, হাওরে একসময় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ধান কাটার শ্রমিক আসতেন। আবার স্থানীয়ভাবেও ধান কাটার শ্রমিক ছিলেন। বাইরের শ্রমিকের আসা একেবারে কমে গেছে। আবার ধান কাটার যন্ত্র চালু হওয়ায় স্থানীয় শ্রমিকেরাও আর আগের মতো ধান কাটেন না।
সদর উপজেলার দেখার হাওরপারের ইছাগড়ি গ্রামের কৃষক আবদুল কাইউম বলেন, ‘এখন মেশিন ছাড়া উপায় নাই। একটা মেশিনে এক দিনে যে পরিমাণ জমির ধান কাটা ও মাড়াই করা যায়, এক শ শ্রমিকের দ্বারা সেটা সম্ভব নয়।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে এবার ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরের গভীর অংশে ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টর এবং হাওর ছাড়া তুলনামূলক উঁচু অংশে ৫৮ হাজার ২৩৬ হেক্টর। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন।
সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে এবার ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরের গভীর অংশে ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টর এবং হাওর ছাড়া তুলনামূলক উঁচু অংশে ৫৮ হাজার ২৩৬ হেক্টর।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জে ধান কাটার জন্য ৫৭৭টি কম্বাইন্ড হারভেস্টর সচল আছে। এ ছাড়া ১০৮টি আছে, যেগুলো সংস্কার করলে কাজে লাগানো যাবে। এগুলোর মালিক ও কোম্পানিকে যন্ত্রগুলো সচল করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রিপার আছে ১৪৬টি। এবার হাওরে হারভেস্টর দিয়ে এক বিঘা (৩৩ শতক) জমির ধান কাটা ও মাড়াইয়ের জন্য মেশিনমালিকেরা ১ হাজার ৯০০ টাকা করে নেবেন বলে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। কোনো মেশিনমালিক কৃষকদের কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি টাকা নিতে পারবেন না।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালাক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, যেসব হাওরে বেশি পানি আছে, সেখানে মেশিন দিয়ে ধান কাটতে সমস্যা হবে। যদি ৮–১০ ইঞ্চি পানি থাকে সেখানে মেশিনে ধান কাটা সম্ভব।
সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, ‘সুনামগঞ্জে মানুষ বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল। এই ধানই আমাদের সব। তাই কৃষকদের ধান গোলায় তুলতে সব ধরনের সযোগিতা দেওয়া হবে। আমরা কৃষকদের পাশে আছি।’